যানজট, আবাসনসংকট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশদূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের মতো বহুমুখী সমস্যায় বর্তমানে জর্জরিত দেশের শহরগুলো। এই সংকটগুলো কাটিয়ে কীভাবে আরও বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও নাগরিকবান্ধব শহর গড়ে তোলা সম্ভব, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার লক্ষ্যে ঢাকায় এক মঞ্চে একত্রিত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের নগরপ্রধান, স্থপতি এবং নগর-পরিকল্পনাবিদগণ।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ আর্কসামিট ২০২৬’ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (বাস্থই) আয়োজনে এই সম্মেলন আগামী রোববার পর্যন্ত চলবে। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কো–ক্রিয়েটিং সিটিজ ফর অল’ বা ‘সবার জন্য সম্মিলিতভাবে নগর গড়ে তোলা’।
বাস্থইয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘মেয়রস টকস’। এই বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নগরপ্রধান এবং নগর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করবেন। তাঁরা নিজ নিজ শহরের বিদ্যমান সমস্যা, নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরবেন।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় রয়েছেন শ্রীলঙ্কার কলম্বো মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের মেয়র ভ্রাই ক্যালি বালথাজার, ফিলিস্তিনের রামাল্লাহর ডেপুটি মেয়র মাজেদ জামাল আমিন আবদুলফাত্তাহ এবং নেপালের ললিতপুরের মহালক্ষ্মী পৌরসভার ডেপুটি মেয়র লক্ষ্মী মহার্জন। এছাড়া নেপালের ধনগড়ি উপমহানগরের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেবেন দিজ রাজ ভাট্টা।
সম্মেলনে আরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে থাইল্যান্ডের আইডিআইএন আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা জেরাভেই হংসাকুল, চীনের আর্কাসিয়ার সভাপতি অধ্যাপক উ জিয়াং এবং জর্ডানের খাম্মাশ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা আম্মার ইয়াসের আহমাদ খাম্মাশের। পাশাপাশি কলম্বো ও রামাল্লাহর নগর-পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরাও এই আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন।
দেশের নগর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল, কুমিল্লা ও খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানদেরও এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, শহরের উন্নয়ন মানেই কেবল নতুন ভবন, সড়ক কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বরং নগরবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থা, আবাসন, উন্মুক্ত স্থান, পরিবেশ রক্ষা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নাগরিক সুবিধায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতেই ‘মেয়রস টকস’ আয়োজন করা হচ্ছে।
চার দিনের এই সম্মেলনে স্থাপত্যশিক্ষা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন আর্কিটেকচারাল এডুকেশন ২০২৬’-এর প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ‘রিথিঙ্কিং আর্কিটেকচারাল এডুকেশন ফর ফিউচার প্র্যাকটিস’। এখানে ভবিষ্যতের পেশাগত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপত্যশিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হবে।
এর পাশাপাশি আয়োজনে থাকছে ‘আর্কিটেক্টস টকস’, বাংলাদেশের সমকালীন স্থাপত্যে উদীয়মান প্রতিভাদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা, ‘আইএবি বিল্ড-এক্সপো’, ‘বিল্ড টকস’, ‘এসিওয়াইএ টকস’, শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নানা আয়োজন।
বাস্থই আরও উল্লেখ করেছে যে, উন্নত শহর গড়ে তোলা কেবল স্থপতিদের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য নগর কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষাবিদ, শিল্প খাত এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এই সম্মেলনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি নগর উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে। সংগঠনটির প্রত্যাশা, এই আয়োজনের আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় ভবিষ্যতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।