মুক্তির পরপরই দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে নেটফ্লিক্সের নতুন জাপানি সিরিজ ‘প্লাস্টিক বিউটি’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিকতা এবং নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে মানুষের ভেতরে থাকা নিরাপত্তাহীনতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই আট পর্বের সিরিজটি বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্সের নন-ইংলিশ টিভি তালিকায় দ্রুত শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় সপ্তাহে এর দর্শকসংখ্যা প্রথম সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

সৌন্দর্য কি মানুষের জন্য আশীর্বাদ, নাকি এটি একটি অভিশাপ? এই মৌলিক প্রশ্নের চারপাশেই আবর্তিত হয়েছে সিরিজটির কাহিনী। গল্পের মূল চরিত্র ফুমি নুমাতা একজন অত্যন্ত দক্ষ জরুরি বিভাগের সার্জন। তাঁর কাছে চিকিৎসার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন বাঁচানো। তবে একটি জটিল অস্ত্রোপচারের পর পরিস্থিতি এমন এক মোড় নেয় যে, ফুমিকে হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। এই ঘটনার পর তিনি কসমেটিক অস্ত্রোপচারের জগতে প্রবেশ করেন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় রিন তইয়ামার সঙ্গে। রিন একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী কসমেটিক সার্জন, যাকে অনেকে ‘হ্যান্ড অব গড’ বলে অভিহিত করেন।

ফুমির সঙ্গে রিনের জীবনদর্শন ও চিন্তার এখানেই শুরু হয় সংঘাত। ফুমির মনে প্রশ্ন জাগে, যে মানুষ শারীরিকভাবে অসুস্থ নয়, তার শরীর পরিবর্তন করার প্রয়োজন কেন হবে? অন্যদিকে রিনের বিশ্বাস, মানুষের মানসিক কষ্টও প্রকৃত কষ্ট; তাই কেবল সৌন্দর্যের জন্য অস্ত্রোপচার করাকে শুধুই অহেতুক ভোগবিলাস হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এই আদর্শিক দ্বন্দ্বই ধীরে ধীরে ক্ষমতা, অর্থ, খ্যাতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং চিকিৎসার নৈতিকতার এক জটিল গল্পে রূপ নেয়।

সিরিজটির অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর অভিনয়শিল্পীদের অসাধারণ পারফরম্যান্স। ফুমির চরিত্রে অভিনয় করেছেন মায়ু মাতসুওকা। ‘শপলিফটার্স’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য পরিচিত এই অভিনেত্রী এখানে এমন একজন চিকিৎসককে ফুটিয়ে তুলেছেন, যিনি অত্যন্ত দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও নিজের নৈতিক অবস্থানের বিষয়ে বেশ একগুঁয়ে। অন্যদিকে, রিন তইয়ামার চরিত্রে দেখা যায় রিসা নাকাকে। তাঁর ফুটিয়ে তোলা চিকিৎসক চরিত্রটির কাছে সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক বিষয় নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার একটি মাধ্যম। এই দুই অভিনেত্রীর অভিনয় সিরিজটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রটেন টমেটোজে প্রকাশিত বিভিন্ন সমালোচনায় মায়ু মাতসুওকা ও রিসা নাকার মধ্যকার দ্বন্দ্বকে সিরিজটির অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউকি সাইতোর পরিচালনায় নির্মিত এই সিরিজটির চিত্রনাট্য লিখেছেন জুনিয়া ইকেগামি। সিরিজটি নির্মাণের আগে নেটফ্লিক্স এবং এর নির্মাতারা জাপানের কসমেটিক সার্জারি শিল্প নিয়ে অত্যন্ত গভীর ও বিস্তর গবেষণা করেছেন। নির্মাতাদের লক্ষ্য ছিল কেবল অস্ত্রোপচারের চমক দেখানো নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সামাজিক ও মানসিক চাপগুলোকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।

সমালোচকদের দৃষ্টিতে নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক নন-ইংলিশ টিভি তালিকায় বর্তমানে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ‘প্লাস্টিক বিউটি’। মাত্র দুই সপ্তাহে সিরিজটি মোট ৬ কোটি ৭৩ লাখ ঘণ্টা দেখা হয়েছে। সিরিজটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মোটের ওপর ইতিবাচক হলেও সবাই পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। মার্কিন বিনোদন ও পপ–সংস্কৃতিবিষয়ক ওয়েবসাইট ডিসাইডার সিরিজটির অভিনয়শিল্পীদের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। পাশাপাশি সিনেমা বিষয়ক ওয়েবসাইট লেজারবাইটও এর অভিনয়, চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলীর প্রশংসা করেছে।

তবে কিছু সমালোচনার জায়গা রয়ে গেছে। ইউটিউব মুভি রিভিউ সাইট ‘বাট হোয়াই থো’র রিভিউতে বলা হয়েছে, “মূল বিষয়টি আকর্ষণীয় হলেও কিছু আন্তসম্পর্কের সমাধান অতিরিক্ত সরল।” তা সত্ত্বেও সাধারণ দর্শকদের মাঝে সিরিজটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক দর্শক লিখেছেন যে, প্রচলিত ক্রাইম–থ্রিলার এবং ফ্যামিলি ড্রামার বাইরে এমন ব্যতিক্রমী গল্পের কারণেই সিরিজটি তাঁদের ভালো লেগেছে।

তথ্যসূত্র: নেটফ্লিক্সডটকম ও আইএমডিবি