বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং স্ক্রিন-টাইমের আধিক্যের কারণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা বইয়ের জগত থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এমন সময়ে পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে এবং মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটাতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এই মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা vanuit ১২ বছর ধরে যুক্ত রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। সম্প্রতি দেশব্যাপী বই পড়ার এই কর্মসূচির এক দশকেরও বেশি সময়ের সফল পথচলা উদ্‌যাপন করতে রাজধানীর এক বিশেষ প্রীতি সম্মিলনের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বই পড়া কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও বিকাশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানস্থল ও মঞ্চটি বই এবং লাইব্রেরির আদলে সাজানো হয়েছিল, যা শিক্ষার্থীদের জন্য এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বইয়ের বিবর্তনের এক ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা শিক্ষার্থীদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটকের অনুপ্রেরণায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাঠ জগৎ নিয়ে ‘অমলের পৃথিবী’ শীর্ষক একটি নাটিকা পরিবেশন করা হয়। শিক্ষার্থীরা তাঁদের পড়া প্রিয় বইগুলোর নামের একটি তালিকা বিশাল এক খাতায় লিপিবদ্ধ করে। বইয়ের সান্নিধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অতিথিদের জন্য বিকেলটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত আনন্দময়।

২০১৪ সাল থেকে টানা ১২ বছর ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিকাশ। এই দীর্ঘ পথচলায় বিকাশের সহায়তায় দেশের প্রায় তিন হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগারে পৌঁছেছে চার লাখেরও বেশি নতুন বই। এর ফলে উপকৃত হয়েছেন ৩২ লাখের বেশি তরুণ পাঠক। এই কর্মসূচির আওতায় ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের কথা বিবেচনা করে তাঁদের উপযোগী সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন এবং জ্ঞানভিত্তিক বই নির্বাচন করা হয়।

প্রীতি সম্মিলনের দেয়ালের এক কোণে এক শিক্ষার্থীর লেখা ছোট একটি কথা সবার নজর কাড়ে— ‘যখন একটি বইয়ের পৃষ্ঠা পড়ি, তখন মনে হয়, দেখি তো সামনে আর কী আছে?’

সেই কৌতূহল ও আগ্রহ ফুটে ওঠে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কথাতেও। রাজধানীর বিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী রিদ্বীন বলেন, ‘অনেক বই অন্যান্য লাইব্রেরিতে পাওয়া না গেলেও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে আমরা সে বইগুলো পাচ্ছি। এসব বই আমাদের জ্ঞান বাড়ায়, আমরা উপকৃত হই।’

অন্যদিকে হলিক্রস স্কুলের একজন শিক্ষার্থী জানান, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—প্রতিদিনই এক পৃষ্ঠা হলেও বই পড়তে হবে। আমি এখন আমার জীবনে বই পড়াটা বাধ্যতামূলক করে নিয়েছি।’

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মতে, কিশোর বয়সেই মননশীলতার দ্রুত বিকাশ ঘটে। এই সময়ে মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারলে তা ভবিষ্যতে তাদের চিন্তাধারায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ‘এই ১২ বছরে আমরা বিকাশের কাছ থেকে ৪ লাখ বই পেয়েছি, যা দেশের ৩২ লাখ ছেলেমেয়ে পড়েছে। বিকাশ যদি এই অর্থ অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করত, তাহলে হয়তো একটু বেশি লাভবান হতো। তা না করে এখানে করেছে। এতে বিকাশ লাভবান হয়েছে কি না, জানি না; কিন্তু জাতি লাভবান হয়েছে।’

শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে বিকাশ। কেবল বাণিজ্যিক বা করপোরেট দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে কামাল কাদীর বলেন, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করার একটা প্রবল আকর্ষণ সেই ছোটবেলায় লাইব্রেরিতে যাওয়া থেকেই আমার মাঝে সুপ্ত ছিল। সবকিছু লাভের দিকে তাকিয়ে আসলে করা ঠিক না। বিকাশ দেখেছে যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এমন একটা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজ করার সুযোগ আছে। তাই এ রকম একটা মহৎ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত থাকার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উচ্চমানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলার এবং বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ শব্দটি আজকাল ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু ফ্যাশনের বাইরে গিয়েও যে বড় কন্ট্রিবিউশন করা যায়, সেটি আজ দেখতে পেলাম। একটি বই হয়তো একটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, আর চার লাখ বই প্রসারিত করতে পারে অসংখ্য শিক্ষার্থীর চিন্তার দিগন্ত। বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে এনে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে বসাতে হবে। সম্মিলিতভাবে আমাদের সবাইকে এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে হবে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও বিকাশের এই যৌথ প্রয়াস কেবল কিছু স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধে বলীয়ান করার এক নিরন্তর সংগ্রাম।