বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট কালোবাজারির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা এবং তা সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন। তার মতে, এই চক্রটি এতটাই গভীরে যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এলেও এই অরাজকতা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ৫৯ মিনিটে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। রেলওয়ের টিকিট কালোবাজারি রোধে পিবিআই-এর তদন্ত এবং বিচারকের মামলা সংক্রান্ত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি তার মতামত ব্যক্ত করেন।
মাহবুব কবির মিলন তার পোস্টে লিখেছেন, “রেলের টিকিট কালোবাজারি, বিচারকের মামলা এবং পিবিআই তদন্তে। খুব চমকপ্রদ এবং আশার আলো দেখছেন তাই না। আরে পিবিআই কেন, খোদ আমেরিকার এফবিআই বা পেন্টাগন কিংবা ক্রেমলিনকে তুলে আনলেও আমাদের রেলের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ হবে না। কয়টা ব্ল্যাকারকে ধরবেন। দুই দিন পর জামিনে বের হয়ে একই কাজ করবে।”
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং উচ্চপর্যায়ের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “বিচারক তো দূরের কথা, খোদ রেলমন্ত্রীকে যদি টিকিট কেটে ট্রেনে উঠতে হতো, তিনিও টিকিট পেতেন না। তাকেও কালোবাজারির কাছ থেকে কিনতে হবে। তখন তদন্তে কাকে নামাবেন।”
সম্প্রতি অনলাইনে টিকিট না পাওয়া নিয়ে বিচারক এবং আশফাক নিপুন সাহেবের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিচারক এবং আশফাক নিপুন সাহেব অনলাইনে টিকিট পাননি। এক মিনিটেই সব শেষ। নিউজফিড আর অনলাইন নিউজে ভাইরাল বিষয়টি। আর আমরা ২০১৫ সাল থেকেই কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে বলে আসছি। অসংখ্য লেখা আছে ফেসবুকে আমার।”
টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনে কেবল কালোবাজারি নয়, বরং অতিরিক্ত যাত্রী চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “হ্যাঁ এক মিনিটেই সব গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের টিকিট শেষ হয়। আপনি সার্ভার ডাটা নিয়ে দেখুন, সব ‘র’ ডাটা চেক করে দেখুন। যাত্রীরাই নিয়েছে। বিভিন্ন নাম, এনআইডি এবং মোবাইল নম্বর দিয়ে। যাত্রী চাপ এত বেশি যে, এসব ট্রেনের টিকিট এক মিনিটেই শেষ হয়। আর এটা দিয়ে আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না যে, কালোবাজারি হচ্ছে রেলের টিকিটে।”
তবে পেশাদার কালোবাজারিদের কৌশলের কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি একটি উদাহরণ দেন। তিনি লেখেন, “তাহলে? আপনি টিকিট করছেন একটা অ্যাকাউন্ট দিয়ে। খুব বেশি হলে আপনার বাসার আর দুই তিনজনের অ্যাকাউন্ট দিয়ে। আমার আছে দুইশত অ্যাকাউন্ট। দুইশত নাম, মোবাইল এবং এনআইডি দিয়ে। সব জেনুইন অ্যাকাউন্ট। তো আপনি সকাল ৮টা ১ সেকেন্ডে একটা টিকিট পেলে আমি কমপক্ষে পঞ্চাশটা টিকিট পাব দুইশত অ্যাকাউন্ট দিয়ে। এরপর ব্ল্যাকে বিক্রি করব। শত শত লোক নিয়োজিত আছে এ কাজে। আমাকে আটকাবেন কীভাবে।”
রেলওয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, “আমাকে আটকাবেন, আরও হাজার হাজার মানুষ জড়িত আছে এ কাজে। নন-স্টপ এবং ইন্টারসিটি ট্রেনের সব এটেন্ডেন্ট টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত। ওরা বেতন পায় না। এ কাজ করে তাদের সংসার চলে। খাবার গাড়ির স্টাফরাও জড়িত। বেতন নেই। অবৈধ যাত্রীই তাদের রুটি রুজি। রেল বেতন দেয়। কিন্তু তা খায় থার্ড পার্টি ভেন্ডার। রেল জানে সব।”
সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, “এবার বলুন পিবিআই বা এফবিআই কালোবাজারি দূর করবে কীভাবে। যদি সিস্টেম না বদলান। রেলও জড়িত এ কাজে। টিকিট কালোবাজারির দায় শতভাগ রেলের।”
টিকিটিং সার্ভিস প্রোভাইডার সহজ ডটকমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, “সার্ভার বা টিকিটিং সার্ভিস প্রোভাদর সহজ ডটকম ৫ শতাংশ টিকিট ব্লক করে কালোবাজারি করে। বাকি ৯৫ শতাংশ টিকিট কালোবাজারি কে করে?”
চুক্তির মেয়াদ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “এই অপরাধ করলে রেল, সহজ ডটকমের চুক্তি বাতিল করে না কেন? আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। আবার নতুন টেন্ডার হবে। লিখে রাখুন তারাই আবার কাজ পাবে।”
তবে সঠিক ইচ্ছা থাকলে খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন, “হ্যাঁ তিন মাসেই কালোবাজারি দূর করা যায়। ছয় মাসে সময় দুই নম্বরি মালামাল সাপ্লাই ঠিকাদারের বারোটা বাজানো যায়। সব ট্রেনের গতি বৃদ্ধি করা যায়। এক বছরের সমস্ত প্রকল্পের দুর্নীতিবাজদের জেলে ভরা যায়।”
সবশেষে একটি সহজ সমাধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ শুধু এটা বাস্তবায়ন করুন। কালোবাজারি শতভাগ দূর হয়ে যাবে। কিন্তু হবে না। রেলের সেই মেরুদণ্ড নেই। আর দুর্নীতির কথা নাইবা বললাম।”