২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ তরুণ-তরুণী একাকিত্ব অনুভব করেন। এই হার বয়স্ক প্রজন্মের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, ডেটিং অ্যাপ, ভিডিও কল—সব মিলিয়ে জেন–জির যোগাযোগ এখন হাতের মুঠোয়। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এ প্রজন্মের মধ্যেই একাকিত্বের অনুভূতি বেশি। ছুটির দিনে কারও সঙ্গে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না, তার সঙ্গে একাকিত্বের অনুভূতির সরাসরি সম্পর্ক নেই।
হার্ভার্ডের দীর্ঘমেয়াদি সুখবিষয়ক গবেষণার অন্যতম পরিচালক মনোরোগবিশেষজ্ঞ রবার্ট ওয়ালডিঙ্গারের মতে, এর একটি উত্তর হতে পারে, নিজের চেয়ে বড় কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখা। অর্থাৎ শুধু নিজের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ব্যস্ত না থেকে অন্য মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রয়োজন ও কল্যাণের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করা।
হার্ভার্ডের ‘স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’ আট দশকের বেশি সময় মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও সুখ নিয়ে গবেষণা করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরবর্তী জীবনে যাঁরা ভালো ছিলেন, তাঁদের অনেকেই তরুণ বয়স থেকেই অন্যদের জন্য কিছু করা বা অর্থপূর্ণ কোনো কাজে অবদান রাখার চেষ্টা করেছেন।
ড. ওয়ালডিঙ্গার একে বলেন ‘পারপাস’ বা জীবনের উদ্দেশ্য। এটি শুধু নিজের পছন্দ বা আনন্দের পেছনে ছোটা নয়; বরং নিজের সময়, দক্ষতা বা সামর্থ্য দিয়ে অন্য মানুষ, সমাজ, পরিবেশ কিংবা নিজের চেয়ে বড় কোনো কিছুর জন্য অবদান রাখা। সন্তানকে বড় করা, কাউকে শেখানো, স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা কিংবা নিজের সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানো—সবই এর অংশ হতে পারে।
মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসনের ভাষায়, এটি ‘জেনারেটিভিটি’, অর্থাৎ নিজের জীবনকে এমন কিছুর সঙ্গে যুক্ত করা, যার অর্থ নিজের অস্তিত্বের বাইরেও ছড়িয়ে যায়।
জীবনের কোনো অর্থপূর্ণ উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কও গভীর হতে পারে। আর অর্থপূর্ণ সম্পর্ক একাকিত্ব থেকে সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব সময় সেই অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করছে না। অসংখ্য বিকল্পের ভিড়ে সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পাওয়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে।
রোমান্টিক সম্পর্কও অনেকটাই ‘সোয়াইপ’নির্ভর। ফলে মানুষকে সময় নিয়ে জানার আগ্রহ, প্রেমে পড়ার বদলে তাকে যেন একটি পণ্য হিসেবেই বেছে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সার্জন জেনারেল বিবেক মূর্তি একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মানুষ মূলত সামাজিক প্রাণী। কিন্তু দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে, যা আবার মানুষকে আরও গুটিয়ে নিতে পারে। ফলে একাকিত্বের চক্র আরও গভীর হয়।
হার্ভার্ডের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, ভালো সম্পর্ক মানুষের স্বাস্থ্য ও সুখের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ বছর বয়সে যাঁরা নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন, ৮০ বছর বয়সে তাঁদের শারীরিক স্বাস্থ্যও তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
প্রতিদিন অন্তত একজন মানুষের খোঁজ নিন। একটি ছোট মেসেজ, ফোনকল কিংবা প্রশংসাও হতে পারে শুরু।
নিজেকে প্রশ্ন করুন, কোন সমস্যা আপনাকে ভাবায়? কোন কাজ করলে অন্যের উপকার হয়, আবার আপনি আনন্দও পান? কোন মানুষ বা গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে চান?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো আপনাকে আপনার জীবনের উদ্দেশ্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। কারণ, দীর্ঘ জীবনে সুখের জন্য শুধু নিজের জন্য বাঁচা নয়, অন্যের জীবনে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য হেলদি