পর্দায় তাঁর মুখ ভেসে ওঠার আগেই কণ্ঠস্বর শুনেই তাঁকে চিনে নেওয়া যেত। সেই ভারী কণ্ঠ, শব্দের ওপর বিশেষ জোর এবং বাক্যের মাঝখানে রহস্যময় বিরতি—আর তারপর সেই চিরপরিচিত সম্বোধন, ‘জানি’। কখনো সেই স্বরে ফুটে উঠত হুমকি, কখনো বিদ্রূপ, আবার কখনো গভীর প্রেম। রাজ কুমারের মুখে সংলাপগুলো হয়ে উঠত প্রতিটি দৃশ্যের প্রধান আকর্ষণ। তাঁর কথা বলার সেই স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং স্বর অনুকরণ করে আজও মিমিক্রি শিল্পীরা দর্শকদের বিনোদিত করেন। রিয়েলিটি শো থেকে শুরু করে পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চ—নানা আয়োজনে বারবার ফিরে আসে তাঁর সংলাপ বলার সেই অনন্য শৈলী।

যুগে যুগে হিন্দি সিনেমার অনেক অভিনেতার সংলাপ জনপ্রিয় হয়েছে, তবে রাজ কুমারের ক্ষেত্রে সংলাপ বলার ধরনটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রধান পরিচয়। তবে তাঁর অভিনয়জীবন কেবল দাপুটে উচ্চারণের গল্প নয়। অসহায় কৃষক, অসুস্থ স্বামী, দ্বিধাগ্রস্ত প্রেমিক কিংবা অভিজাত ব্যক্তিত্বের চরিত্রেও তিনি স্মরণীয় কাজ করে গেছেন। আজ ৮ অক্টোবর তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৯২৬ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেলুচিস্তানের লোরালাইয়ে (এখন পাকিস্তানে) জন্মেছিলেন তিনি। জন্মনাম ছিল কুলভূষণ পণ্ডিত। পুলিশের চাকরি ছেড়ে চলচ্চিত্রে আসা রাজ কুমার চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করেছেন।

কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান কুলভূষণের কর্মজীবনের শুরুটা অভিনয়ে হয়নি। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে তিনি বোম্বে পুলিশের উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে পুলিশের চাকরি ছেড়ে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন এবং দর্শকদের কাছে পরিচিত হন রাজ কুমার নামে। ১৯৫২ সালের ‘রঙ্গিলি’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। তবে প্রথম ছবিতেই তিনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি; প্রতিষ্ঠা পেতে তাঁকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পর্দায় যে প্রবল আত্মবিশ্বাসী মানুষটিকে দেখা গেছে, তাঁর শুরুর দিনগুলো ছিল যথেষ্ট সংগ্রামের।

‘মাদার ইন্ডিয়া’র সেই অসহায় কৃষকের কথা মনে আছে? নার্গিসের স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটিই ছিলেন রাজ কুমার—যাঁর দাপুটে উপস্থিতি পরবর্তী সময়ে তাঁর ট্রেডমার্ক হয়ে দাঁড়ায়। মেহবুব খানের ১৯৫৭ সালের এই ছবিটি তাঁকে পরিচিতি এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গল্পের কেন্দ্রে নার্গিস থাকলেও ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নজর কাড়েন রাজ কুমার। পরবর্তী সময়ের অভিজাত ও কর্তৃত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর পাশে এই বিপন্ন মানুষটিকে রাখলে বোঝা যায়, তাঁর অভিনয়ের শক্তি শুধু জোরালো সংলাপে সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯৫৯ সালে ‘পয়গাম’ ছবিতে দিলীপ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি, যেখানে তাঁকে দেখা যায় একজন শ্রমজীবী মানুষের চরিত্রে। সামাজিক ও পারিবারিক গল্পের পাশাপাশি প্রেমের ছবিতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করছিলেন রাজ কুমার।

রাজ কুমারকে শুধু রাগী, কঠিন কিংবা কর্তৃত্বপূর্ণ চরিত্রে মনে রাখলে তাঁর অভিনয়ের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কিশোর সাহু পরিচালিত ‘দিল আপনা অউর প্রীত পরাই’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে। সেখানে চিকিৎসকের ভূমিকায় রাজ কুমার এবং নার্সের ভূমিকায় মীনা কুমারী। দুজনের মধ্যে ভালোবাসা জন্মালেও পারিবারিক দায় ও অন্য একটি বিয়ের কারণে সম্পর্কটি জটিল হয়ে ওঠে। এই গল্পে রাজ কুমারের সংযত অভিনয় তাঁর পরিচিত দাপুটে ভাবমূর্তির বাইরের একটি দিক উন্মোচিত করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘দিল এক মন্দির’। ১৯৬৩ সালের এই ছবিতে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত স্বামী; মীনা কুমারী তাঁর স্ত্রী এবং রাজেন্দ্র কুমার চিকিৎসক। অসুস্থতা, ভালোবাসা ও অতীত সম্পর্কের টানাপোড়েনে তৈরি হয় গল্পের সংকট। এই চরিত্রে রাজ কুমারের শক্তি ছিল অসহায়তা প্রকাশে। যে অভিনেতাকে পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষের সামনে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে, এখানে সেই মানুষটিই রোগের কাছে পরাজিত ও বিপন্ন। এই চরিত্রের জন্য ১৯৬৪ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। দুই বছর পর একই বিভাগে দ্বিতীয় পুরস্কার আসে ‘ওয়াক্ত’ ছবির জন্য। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে এবং পুরস্কার পান ১৯৬৬ সালে। ফিল্মফেয়ারের নিজস্ব পুরস্কার তালিকায় তাঁর এই দুই স্বীকৃতির কথা উল্লেখ রয়েছে।

যশ চোপড়ার ‘ওয়াক্ত’ রাজ কুমারের তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি। সুনীল দত্ত, শশী কাপুর, বলরাজ সাহনি, সাধনা ও শর্মিলা ঠাকুরের মতো তারকাদের ভিড়েও তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র। পোশাক, আত্মবিশ্বাস ও সংলাপের ভঙ্গি মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। ফিল্মফেয়ারের মূল্যায়নেও ছবিতে তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্যের কথা বলা হয়েছে।

রাজ কুমারের সংলাপে শব্দের পাশাপাশি বিরতির ব্যবহার ছিল অসাধারণ। একটি কথা শেষ করে পরের কথাটি বলার আগে তিনি যে সময় নিতেন, তা দৃশ্যের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিত। কখনো তাঁর চরিত্র প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাত, কখনো ঠান্ডা মাথায় বিদ্রূপ করত। উচ্চারণে থাকত এমন নিশ্চয়তা, যেন নিজের ক্ষমতা নিয়ে চরিত্রটির কোনো সংশয় নেই। রাজ কুমারের এই ভঙ্গি অনুসরণ করা সহজ মনে হলেও পর্দায় তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রবল উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ। শুধু গলা ভারী করলেই রাজ কুমারের প্রভাব তৈরি হতো না; চোখের চাহনি, মুখের অভিব্যক্তি এবং কথার গতি মিলে দৃশ্যটি পূর্ণতা পেত।

ফিল্মফেয়ার লিখেছে, একসময় রাজ কুমারের জন্য সংলাপ লেখার ক্ষেত্রে লেখকদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা চলত; অর্থাৎ সংলাপ তাঁর ছবিতে শুধু গল্প এগিয়ে নেওয়ার উপকরণ ছিল না; দর্শকের জন্য আলাদা আকর্ষণও ছিল। কঠিন কথার মতো কোমল সংলাপও রাজ কুমারের কণ্ঠে আলাদা মাত্রা পেয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ ‘পাকিজা’। কামাল আমরোহির ১৯৭২ সালের ছবিতে তাঁর চরিত্রের নাম সেলিম আহমেদ খান। ট্রেনে ঘুমিয়ে থাকা মীনা কুমারীর চরিত্রের পায়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সেলিম একটি বার্তা রেখে যায়। সেই বিখ্যাত কথার বাংলা অর্থ, ‘আপনার পা দেখেছি, খুব সুন্দর; মাটিতে রাখবেন না, ময়লা হয়ে যাবে।’ হিন্দি সিনেমার স্মরণীয় সংলাপের আলোচনায় আজও এই বার্তাটি উঠে আসে। এখানে রাজ কুমারের কণ্ঠের দৃঢ়তা বদলে যায় মুগ্ধতায়। কথায় কোনো হুমকি নেই, আছে সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ। ‘পাকিজা’র প্রেমিককে দেখলে বোঝা যায়, পরিচিত উচ্চারণভঙ্গির মধ্যেও রাজ কুমার আবেগের পার্থক্য তৈরি করতে পারতেন। ভালোবাসার বাক্যেও বজায় থাকত তাঁর নিজস্ব ছন্দ।

চেতন আনন্দের ‘হীর রাঞ্ঝা’য় তাঁর কণ্ঠের আরেক ব্যবহার দেখা যায়। ১৯৭০ সালের এই ছবিতে বিপরীতে ছিলেন প্রিয়া রাজবংশ। পাঞ্জাবের বিখ্যাত প্রেমকাহিনি নিয়ে নির্মিত ছবিটির সংলাপ লিখেছিলেন কবি কাইফি আজমি—যা ছিল সম্পূর্ণ পদ্যে। স্ক্রলের চলচ্চিত্রবিষয়ক আলোচনায় এই বৈশিষ্ট্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পদ্যে লেখা সংলাপ অভিনয়ের জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ। ছন্দ বজায় রাখার পাশাপাশি চরিত্রের কথা যেন নিছক আবৃত্তি হয়ে না ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। রাজ কুমারের দৃঢ় উচ্চারণ এই ছবিতে প্রেম ও বেদনার প্রকাশে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ওয়াক্ত’-এর আত্মবিশ্বাসী মানুষ এবং ‘হীর রাঞ্ঝা’র প্রেমিককে পাশাপাশি দেখলে তাঁর অভিনয়ের বৈচিত্র্য স্পষ্ট হয়।

রাজ কুমারের অভিনয়জীবনের শেষ পর্বের বড় ঘটনা ‘সওদাগর’। সুভাষ ঘাইয়ের ১৯৯১ সালের এই ছবিতে আবার একসঙ্গে অভিনয় করেন দিলীপ কুমার ও রাজ কুমার। ‘পয়গাম’-এর পর তাঁদের পর্দায় পুনর্মিলন ঘটে ৩২ বছর পর। নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতির মধ্যেও দুই প্রবীণ তারকার মুখোমুখি অভিনয় ছিল ছবিটির বড় আকর্ষণ। তাঁদের এক ছবিতে নেওয়া নিয়ে সংশয়ের কথা পরে জানিয়েছেন সুভাষ ঘাই। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে জানা যায়, দুই অভিনেতার সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা বলে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবু ঘাই দুজনকেই চেয়েছিলেন। পরিচালকের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, সহশিল্পী হিসেবে দিলীপ কুমারের নাম শুনে রাজ কুমার তাঁকে অভিনেতা হিসেবে উচ্চ মর্যাদা দেওয়ার কথা জানান এবং চরিত্রটির জন্য উপযুক্ত বলে মেনে নেন। নিজের অভিনয় নিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসী রাজ কুমারের এই প্রতিক্রিয়া সহশিল্পীর প্রতি তাঁর মূল্যায়নেরও পরিচয় দেয়।

১৯৯৩ সালের ‘তিরঙ্গা’য় রাজ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। মেহুল কুমার পরিচালিত ছবিতে দুই প্রজন্মের দুই স্বতন্ত্র অভিনেতার উপস্থিতি তৈরি করে আলাদা রসায়ন। একজনের সংলাপে পরিমিত গতি ও কর্তৃত্ব, অন্যজনের অভিনয়ে তীব্রতা—দুজনের এই পার্থক্যই ছবিটির আকর্ষণের অংশ হয়ে ওঠে। তবে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করানোর শুরুটা সহজ ছিল না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত মেহুল কুমারের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, নানা শর্ত দিয়েছিলেন—রাজ কুমার তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করলে তিনি সেট ছেড়ে চলে যাবেন। দুজনের ব্যক্তিত্ব নিয়ে পরিচালককে সতর্ক থাকতে হয়েছিল।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অভিনয় করেছেন রাজ কুমার। তাঁর শেষ অভিনীত ছবি ‘গড অ্যান্ড গান’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৬ সালের ৩ জুলাই মুম্বাইয়ে মারা যান তিনি। বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

পর্দায় তাঁর উপস্থিতি জাঁকালো হলেও নিজের শেষযাত্রা নিয়ে ইচ্ছা ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত। পরিচালক মেহুল কুমারের স্মৃতিতে আছে সেই ঘটনা। ১৯৮৭ সালের ‘মরতে দম তক’ ছবির একটি মৃত্যুদৃশ্যের শুটিংয়ে রাজ কুমার জানিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর শেষকৃত্য যেন চলচ্চিত্রজগতের প্রদর্শনী হয়ে না ওঠে। তারকার শেষযাত্রায় লোকসমাগম ও প্রচারের বদলে পরিবারের মধ্যে বিদায় চেয়েছিলেন তিনি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত মেহুলের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজ কুমারের মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছিলেন পরিবারের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার পর। ছেলে পুরু রাজ কুমার তাঁকে ফোন করেছিলেন। পরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে মেহুল দেখেন, সেখানে খুব অল্প মানুষ; রাজ কুমার যেমনটি চেয়েছিলেন।

রাজ কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর অভিনীত ‘পাকিজা’ও নতুন রূপে আন্তর্জাতিক পর্দায় ফিরছে। ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, দুই বছরের চেষ্টায় ছবিটি ফোরকে প্রযুক্তিতে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। নতুন সংস্করণটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হবে ফ্রান্সের লিওঁ শহরের লুমিয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে; এরপর প্রদর্শিত হবে লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে। এর মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় উন্নত ছবি ও শব্দে মীনা কুমারী ও রাজ কুমারের অভিনয় দেখার সুযোগ পাবেন নতুন প্রজন্মের দর্শক।