কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে প্রসবের সময় নবজাতকের মাথায় আঘাত লেগে মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকের চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা চিকিৎসক ডা. খাইরুন্নাহার কেয়া এবং সংশ্লিষ্ট আল নূর হাসপাতালের দায়ভার নিরূপণের লক্ষ্যে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশিদ আহমেদ চৌধুরী তোফায়েল এই তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।
তদন্ত কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মোছা. ফারজানা খন্দকারকে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানা গেছে যে, গত শনিবার (৩ অক্টোবর) চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল সড়কের আল নূর হাসপাতালে ডা. খাইরুন্নাহার কেয়ার তত্ত্বাবধানে শুভপুর ইউনিয়নের খামার পুস্করনী গ্রামের প্রবাসী মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী নাজমা আক্তারের স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি করানোর চেষ্টা করা হয়। তবে স্বজনদের গুরুতর অভিযোগ, প্রসব প্রক্রিয়ার সময় নবজাতকের মাথায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে শিশুটি মারা যায়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর গত সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রসূতির স্বজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা এবং অবহেলার অভিযোগ উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এরই মধ্যে ডা. কেয়ার ফেসবুক আইডিতে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করে। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “এখন থেকে ডেলিভারির ব্যথা উঠলে সাংবাদিকদের কাছে যাবেন অথবা ব্যথা কেন উঠছে না, পানি কেন ভাঙছে এই যাবতীয় সিদ্ধান্ত সাংবাদিক থেকে নিয়ে উনাকেই বলবেন চিকিৎসাটা করতে।”
তার এই মন্তব্য সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
তবে ভাইরাল হওয়া ওই পোস্টের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে ডা. খাইরুন্নাহার কেয়া দাবি করেন, তিনি সকল সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে ওই কথা বলেননি।
তার ভাষ্য, “আমি কিছুসংখ্যক মানুষ, যারা তিলকে তাল বানায় এবং সাংবাদিক পরিচয়ে ঘুরলেও প্রকৃত সাংবাদিক না, তাদের উদ্দেশ্যে পোস্টটি করেছিলাম। সব সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে এটি লেখা হয়নি।”
তিনি আরও জানান, এই বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় তিনি পরবর্তীতে আরেকটি পোস্টের মাধ্যমে ক্ষমা চেয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন।
নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিতর্কিত মন্তব্য—এই দুই বিষয় বর্তমানে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসক বা হাসপাতালের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পরেই স্পষ্ট হবে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশিদ আহমেদ চৌধুরী তোফায়েল বলেন, “আলোচিত ঘটনায় সাংবাদিকদের বিষয়ে করা মন্তব্যে আমরাও বিব্রত। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের দায় এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।