ফেসবুকে নারী পরিচয় দিয়ে এক ইতালি প্রবাসীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পরবর্তীতে বিয়ের কথা বলে প্রতারণার অভিযোগে নাটোরে এক তরুণ ও তাঁর বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত তরুণের নাম শান্ত আলী এবং তাঁর বাবার নাম শহিদুল ইসলাম।

ঘটনার সূত্রপাত প্রায় ছয় মাস আগে। ইতালি প্রবাসী খোরশেদ আলীর (৪৮) সঙ্গে ফেসবুকে সুমাইয়া নামের এক নারীর পরিচয় হয়। মেসেঞ্জারে দীর্ঘ আলাপচারিতার পর তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন এবং একপর্যায়ে মুঠোফোনেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। তবে বিয়ের পর থেকে ভিডিও কলে চেহারা দেখতে চাইলেও সুমাইয়া নামের ওই ব্যক্তি বিভিন্ন অজুহাতে নিজেকে আড়ালে রেখেছিলেন।

গত বুধবার দুপুরে খোরশেদ আলী যখন সুমাইয়াকে ভিডিও কল করেন, তখন কলটি ধরেন নাটোরের লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম। ওসি খোরশেদকে জানান, যাকে তিনি নারী ভেবে বিয়ে করেছেন, তিনি আসলে নারী নন, বরং শান্ত আলী নামের এক তরুণ। মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে খোরশেদ আলীকে প্রতারিত করেছেন এবং টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

ভুক্তভোগী খোরশেদের দাবি, বিয়ের পর গত কয়েক মাসে ভরণপোষণ এবং অন্যান্য নানা প্রয়োজনে ওই তরুণের কাছে তিনি তিন লাখ টাকার বেশি অর্থ দিয়েছেন। ভিডিও কলে চেহারা দেখতে চাইলে কথিত সুমাইয়া দাবি করতেন যে, তাঁর মুঠোফোনের সামনের ক্যামেরাটি অকেজো। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বাহানা দিয়ে তিনি নিজেকে আড়ালে রেখেছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রতারণার অভিযোগে গতকাল সকালে লালপুরের গন্ডবিল গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে শান্ত আলী ও তাঁর বাবা শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের আটকের পরই কথিত সুমাইয়ার আসল পরিচয় সামনে আসে। পুলিশ যখন ভিডিও কলে প্রথমবারের মতো কথিত স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার নামধারী শান্ত আলীকে খোরশেদের সামনে আনেন, তখন খোরশেদ আলী বলেন, ‘পৃথিবীতে এমন ধরনের প্রতারক থাকতে পারে, তা আমি কখনোই ভাবিনি। ওর সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।’

তদন্ত করে পুলিশ জানতে পেরেছে, ২০ বছর বয়সী শান্ত আলী পড়াশোনা জানেন না, তবে প্রযুক্তির ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। মুঠোফোনে বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি নারী কণ্ঠে কথা বলতে এবং খুদে বার্তা আদান-প্রদান করতে পারতেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মুঠোফোনে বিয়ের পর খোরশেদ আলী কথিত সুমাইয়ার বাবা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে বহুবার শ্বশুর হিসেবে কথা বলেছেন। শহিদুল ইসলামের কথাবার্তায়ও শান্ত আলীর প্রতারণার বিষয়টি খোরশেদের কাছে ধরা পড়েনি। পুলিশের ভাষ্যমতে, শহিদুল ইসলাম বিষয়টি অবগত থাকা সত্ত্বেও তাঁর ছেলেকে এই প্রতারণার কাজে সহায়তা করেছেন।

গতকাল সকালে শান্ত ও শহিদুলকে গ্রেপ্তারের সময় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। ওই ফোনগুলোতে খোরশেদ আলীর সঙ্গে খুদে বার্তা বিনিময়ের প্রচুর প্রমাণ পাওয়া গেছে। শান্ত আলী প্রথমে একজন নারীর ছবি ব্যবহার করে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলেন এবং ওই প্রবাসীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে পরিচিত হয়ে কথাবার্তা শুরু করেন। ফেসবুকে ব্যবহৃত ওই নারীর তিনটি ছবিও তিনি খোরশেদ আলীকে পাঠিয়েছিলেন।

খোরশেদ আলীর বরাত দিয়ে ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, “শান্ত আলী প্রথমে একজন নারীর ছবি দিয়ে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলেন। পরে ওই প্রবাসীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে পরিচিত হন এবং কথাবার্তা শুরু করেন। ফেসবুকে ব্যবহৃত ওই নারীর তিনটি ছবিও তিনি খোরশেদ আলীকে পাঠান।”

ওসি আরও জানান, বাড়ির পাশের জমি কেনার কথা বলে একদিনেই প্রায় দুই লাখ টাকা নিয়েছেন শান্ত আলী। এছাড়া দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার কথা বলে আরও টাকা নেওয়া হয়েছে। এভাবে মোট তিন লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

এই ঘটনায় শান্ত আলী ও শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।