ফরিদপুরে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার এক চরম অবহেলার অভিযোগে দীর্ঘ ছয় মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নার্স বিথী আক্তার (২৫)।

রাজবাড়ী থেকে রেফার করা হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

বিথীর স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের চরম অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসার কারণেই অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে এই ডিপ্লোমা মিডওয়াইফকে। বিথীর আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবার ও এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিথীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার স্বামী রাকিবুল ইসলাম।

মৃত বিথী আক্তার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তমিজ উদ্দিন মৃধার পাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পেশায় তিনি একজন ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. তামান্না এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দের মাধ্যমে বিথীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ওই অস্ত্রোপচারের সময় বিথী আক্তারের পেটের ভেতরে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়।

সেই ঘটনার পর থেকেই বিথী মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন। মৃত্যুর আগে তিনি হাসপাতালের সিসিইউতে (কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট) চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছিলেন।

পরিবারের দাবি, অস্ত্রোপচারের সময় পেটের ভেতরে গজ রেখে সেলাই করার ফলে তিনি তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও নানা জটিলতার সম্মুখীন হন।

রাকিবুল ইসলাম বলেন, “বিথীর অবস্থার অবনতি হলে প্রথম অস্ত্রোপচারের প্রায় দুই মাস পর পুনরায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করাতে হয়। পেটের নাড়িতে গুরুতর জটিলতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাকে আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে হয়।” পরিবারের আরও ভাষ্য অনুযায়ী, বিথীকে বাইপাস সার্জারিসহ একাধিক জটিল চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অসুস্থতায় বিথীর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। পরিবারের দেওয়া তথ্যমতে, অসুস্থ হওয়ার আগে তার ওজন ছিল ৬১ কেজি, যা অসুস্থতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নেমে আসে প্রায় ৩৮ কেজিতে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিথী তার নবজাতক সন্তানকেও স্বাভাবিকভাবে সময় দিতে পারেননি। এমনকি সন্তানকে কোলে নেওয়া কিংবা বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো শারীরিক অবস্থাতেও তিনি ছিলেন না বলে জানিয়েছে পরিবার।

অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিথীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে চরম অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে।

ভুল চিকিৎসার বিষয়ে জানতে ডা. তামান্নার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোনটি ধরেননি। ফলে তার তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা জানান, বিথীর মৃত্যুর খবর তিনি শুনেছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসক ইতিমধ্যে বিথীর শিশুসন্তানকে দেখতে দুইবার ওই বাড়িতে গিয়েছেন। ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিথীর মৃত্যুতে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। একই সঙ্গে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগটি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।