নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির (বার) আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। মূলত সভাপতি পদের প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত। একসময় একই রাজনৈতিক আদর্শের অধীনে থাকা এই দুই ব্যক্তিত্বের একজন হলেন বারের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান এবং অন্যজন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আনোয়ার প্রধান। জেলার আইনজীবী অঙ্গনে তাঁরা দীর্ঘকাল ধরে গুরু ও শিষ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তবে বর্তমানে তাঁরা মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন।

আসন্ন নির্বাচনে সভাপতি পদে কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়েই এই গুরু-শিষ্যের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে দুজনেরই যথেষ্ট প্রভাব ও পৃথক অনুসারী রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নিয়োগ এবং আদালত স্থানান্তরের কার্যক্রম নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে।

এই টানাপোড়েনের চরম পর্যায়ে গত মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় কয়েকজন আইনজীবী লাঞ্ছিত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। তবে এই ঘটনার পর গতকাল বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত থানায় কোনো পক্ষই জিডি বা মামলা দায়ের করেনি।

হাতাহাতির এই ঘটনাটি দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে রয়েছেন বর্তমান সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবিরসহ আইনজীবীদের একটি বড় অংশ। অন্যদিকে, এইচ এম আনোয়ার প্রধানের সঙ্গে রয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি আবুল কালাম আজাদ এবং তাঁদের অনুসারীরা।

সাখাওয়াত হোসেন খান বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একসময় ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলেন, তবে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হন। এছাড়া আলোচিত সাত খুন মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন।

অন্যদিকে, আনোয়ার প্রধান নারায়ণগঞ্জ সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সমর্থনে এর আগে দুবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। সূত্রমতে, আনোয়ার প্রধান আগামী নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। তবে সাখাওয়াত হোসেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ আইনজীবীরা এবার সভাপতি পদে আইনজীবী জাকির হোসেনকে প্রার্থী করতে চান। মূলত এই প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করেই আনোয়ার প্রধানের সঙ্গে সাখাওয়াতের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।

সাখাওয়াত হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “আনোয়ার প্রধান ইতিমধ্যে দুবার সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এবার সভাপতি পদে আইনজীবী জাকির হোসেনকে তাঁরা চান।”

নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি এবং কোনো পক্ষই চূড়ান্ত প্যানেল প্রকাশ করেনি। প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া এখনো আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও এই আলোচনা থেকেই বিরোধের জন্ম হয়েছে।

বিরোধের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি নিয়োগের বিষয়টি। গত ২৫ আগস্ট সরকার আইনজীবী সুমন মিয়াকে ওই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি নিয়োগ দিলেও তিনি নির্ধারিত চেম্বারে বসতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, আনোয়ার প্রধান এবং পিপি আবুল কালাম আজাদের অনুসারীরা ওই চেম্বারে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

এই বিষয়ে সুমন মিয়া মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, তাঁকে পিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও আইনজীবীদের একটি অংশের বিরোধের কারণে তাঁকে চেম্বারে বসতে দেওয়া হচ্ছে না।

পাল্টা জবাবে আনোয়ার প্রধান বলেন, “সুমন মিয়া আইনজীবী সমিতির সদস্য নন। তাঁকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আইনজীবীদের আপত্তি রয়েছে। বারের সদস্যদের মধ্য থেকে ওই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি তাঁদের।”

অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার যাঁকে পিপি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত।

এছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (বিদ্যুৎ ও শ্রম আদালত) কার্যক্রম কোথায় চলবে, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। আনোয়ার প্রধানের অনুসারীরা চানমারী এলাকা থেকে আদালত স্থানান্তরের বিপক্ষে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আদালত স্থানান্তরের বিষয়টি চেম্বার, মামলা পরিচালনা এবং মক্কেলের যাতায়াতের মতো পেশাগত সুবিধার সঙ্গে যুক্ত থাকায় বারের রাজনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবির মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “গত মঙ্গলবার সাখাওয়াত হোসেন তাঁদের আমন্ত্রণে বারে এসেছিলেন। সেখানে আদালত স্থানান্তর নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেনকে উদ্দেশ করে অশোভন মন্তব্য করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।” তিনি আরও বলেন, “বারের আগামী নির্বাচনে আনোয়ার প্রধানকে সভাপতি পদে প্রার্থী করা হবে না, এটা বুঝতে পেরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়।”

এই বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ করেন, তাঁকে উদ্দেশ্য করে অশোভন ও অশ্লীল মন্তব্য করা হয়েছে এবং প্রতিবাদ করায় তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না জেনে আনোয়ার প্রধান ও পিপি আবুল কালাম উসকানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন।”

অন্যদিকে পিপি আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, সাখাওয়াত হোসেনের অনুসারীরা তাঁদের ওপর হামলা করেছেন এবং তিনি এতে আহত হয়েছেন। আনোয়ার প্রধান বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ একই হলেও তাঁরা (সাখাওয়াত হোসেনের অনুসারীরা) বারকে কুক্ষিগত করে রাখতে চান।”

সাখাওয়াত হোসেনের অনুসারীদের দাবি, আনোয়ার প্রধান যখন বারের রাজনীতিতে উত্থান পান, তখন তিনি সাখাওয়াত হোসেনের প্রভাব ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, সাখাওয়াত হোসেন দুই মেয়াদে বারের সভাপতি এবং একবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাখাওয়াত হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “আইন পেশায় দীর্ঘদিন আমার শিষ্য ছিলেন আনোয়ার প্রধান। গতবারই আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যাঁরা এর আগে দুই মেয়াদে সভাপতি পদে কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরা একই পদে আর নির্বাচন করতে পারবেন না। এরপরও সে (আনোয়ার প্রধান) এবার সভাপতি পদে প্রার্থী হতে চাইছে, তাঁকে না করা হয়েছে। এটি মানতে না পেরে মঙ্গলবারের ঘটনা ঘটিয়েছে। কেবল নৈতিকতার অবনতি হলে গুরুর সঙ্গে কোনো শিষ্য এমন ঘটনা ঘটাতে পারে।”

সাখাওয়াত হোসেন আরও জানান, সরকার পিপি হিসেবে যাঁকে নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত।

সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আনোয়ার প্রধান মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে এক বছর তিনি আইন পেশার সঙ্গে ছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক গুরু-শিষ্যের হলেও কেন বিরোধ তৈরি হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রশাসকের চেয়ার পেয়ে গেছেন তিনি, এখন আর আমাদের প্রয়োজন নেই। তিনি আদালত স্থানান্তর করতে চান। বারের সদস্য নন, এমন ব্যক্তিকে তিনি পিপি বানিয়েছেন।”

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সাধারণ আইনজীবীরা বিব্রত। তাঁদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাব পেশাগত ক্ষেত্রে পড়তে পারে। এ বিষয়ে গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি আইনজীবী আওলাদ হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনজীবীরা কাজ করেন। আইনজীবীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া কিংবা নিজেরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই কাম্য হতে হতে পারে না। এটি সবার জন্য বিব্রতকর।”