শ্যামলী থেকে মোহাম্মদপুরে যাওয়ার যে কতশত রাস্তা আছে, আল্লাহ মালুম! আমি হলফ করে শুধু এটুকু বলতে পারি, রিকশাওয়ালা মামারা জীবনেও একই রাস্তা দুবার ব্যবহার করেন না।

‘মামা, অমুক রাস্তা দিয়ে যান না ক্যান?’ এ প্রশ্ন করলে তাঁরা এমন দৃষ্টিতে তাকান, যেন আমি তাঁদের মুখে বিষ্ঠা ছুড়ে মারার মতো বিশাল একটা অপরাধ করে ফেলেছি। তারপর স্রেফ নির্লিপ্তভাবে বলেন, ‘মামা, ওই রাস্তায় জ্যাম বেশি।’

আর এমন এক অচেনা গলিতে ঢুকে পড়েন, যেটা দেখলেই মনে হবে, এ রাস্তার কোনো ভূত–ভবিষ্যৎ আগে ছিল না, এখনো নাই। সামনে গেলে একেবারে কানাগলি ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না।

এ রকম কয়েক দিন একেক রিকশাওয়ালাকে একেক রোডের কথা বললাম। তাঁদের উত্তরে যা বুঝলাম, আমি যেদিন যে রোডের কথা বলি, সেদিন সেই রোডেই সবচেয়ে বেশি জ্যাম থাকে। ঢাকা শহরের জ্যাম যে পুরাই আনপ্রেডিক্টেবল, তা যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য। আর সেই জ্যামের প্রেডিকশন আমি ১০০% অ্যাকিউরেসি–সহকারে দিচ্ছি, তা–ও আবার প্রতিদিন! এটা ভেবে আমি যে কিঞ্চিৎ গর্ব বোধ করি না, তা বলাটা ঠিক হবে না।

তবে এ গর্ব কয়েক দিনের মাথায়ই খর্ব হয়ে গেল। আমার প্রেডিকশন যে শুধু জ্যামের ক্ষেত্রেই খাটে, সেটা জানতে হলো কিছু টাকা গচ্চা দিয়ে। শেয়ারবাজারে ভুলভাল কোম্পানির শেয়ার কিনে হাজার দশেক টাকা হারানোর পর থেকে আমি জ্যামের প্রেডিকশন দেওয়াও বাদ দিয়েছি। যা–ই হোক, সে ভিন্ন গল্প। অন্য কোনো দিন হবে।

এদিকে রিকশায় আমার প্রতিদিনই ‘পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে’ অবস্থা আগের মতোই বহাল আছে। একদিন দেখি আমি জহুরী মহল্লায়। তো হুট করে পরদিন নিজেকে আবিষ্কার করি ইকবাল পট্টিতে! অন্য একদিন দেখলাম, জাপান গার্ডেন সিটি পার হচ্ছি, আর আজ কোনো এক অদ্ভুত জাদুবলে সোজা জেনেভা ক্যাম্পের পাশে এসে হাজির হলাম।

কীভাবে এসব ঘটে, তা আমার জানা নেই। মাঝেমধ্যে অবশ্য ঠিক দিকে যাচ্ছি কি না, সেটা দেখতে গুগল ম্যাপ খুলে বসি। আল্লাহর ওয়াস্তে সে আরেক নতুন সার্কাসে পরিণত হয়। গুগল ম্যাপসও বেশির ভাগ সময় আমার মতো ভিরমি খেয়ে পড়ে থাকে।

একবার তো ম্যাপে দেখাল যে আমি নাকি ‘হেলাল ম্যানশন’ নামের কোনো এক ভবনের ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি! এটা ঠিক যে সব সময়ই আমি চেয়েছি হ্যারি পটারের মতো ফ্লাইং ব্রুমে উড়ে বেড়াতে। তবে রিকশায় বসে ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়াটা কল্পনা করার জন্য যে উর্বর মস্তিষ্কের প্রয়োজন, তা আমার কোনোকালেই ছিল না।

আগে যেকোনো নতুন রাস্তা আবিষ্কার করা আমার খুবই অ্যাডভেঞ্চারাস লাগত। কিন্তু মোহাম্মদপুরের ক্ষেত্রে বিষয়টা মোটেও এমন লাগছে না। আমি রীতিমতো আতঙ্কিত। এখানকার রাস্তার প্রতিটা বাঁক যেন একেকটা থ্রিলার মুভির ‘প্লট টুইস্ট’। কোন রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে কোন রাস্তায় পড়ব, সেই থ্রিল সব সময় জমজমাট হয়ে ওঠে।

তাই এ পর্যায়ে এসে আমি শ্যামলী থেকে মোহাম্মদপুরের রাস্তা মুখস্থ করার বৃথা চেষ্টা পুরোপুরি বাদ দিয়েছি।

এখন আমি চুপচাপ রিকশায় উঠে বসি আর মনে মনে খাঁটি অন্তরে দোয়া করতে থাকি, রিকশাওয়ালা মামা যেন কোনো সক্রিয় ‘ছিনতাইকারী’ বা ‘মানব পাচারকারী’ চক্রের সদস্য না হন আর আমি যেন অন্তত জানটা নিয়ে ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি!