বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশিদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভাষাশিক্ষায় আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ১ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এই তহবিলটি প্রদান করা হবে, যার আওতায় বিদেশগামী কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পাঁচটি ধাপে প্রদান করা হবে ১ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে এই বিশেষ ঋণ স্কিম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন তফাদার। তিনি জানান, মোট ১ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলটি ২০০ কোটি টাকা করে পাঁচটি সমান কিস্তিতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে দেওয়া হবে। তবে প্রতিটি কিস্তির অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার পরেই পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে।
সুদের হার ও ঋণের মেয়াদ
এই ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ শতাংশ। ঋণের প্রাথমিক মেয়াদ হবে তিন বছর, যার মধ্যে প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হবে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে এই মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন এবং এর জন্য কোনো জামানতের প্রয়োজন হবে না। তবে ঋণের বিপরীতে দুজন গ্যারান্টর প্রদান করতে হবে। তাদের মধ্যে একজন হতে হবে পরিবারের নিকটতম সদস্য এবং অন্যজন হতে হবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও ঋণ পরিশোধে সক্ষম কোনো ব্যক্তি।
প্রশিক্ষণ ও খরচের আওতা
বিদেশে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শিক্ষা বা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার প্রশিক্ষণের টিউশন ফি এই ঋণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে থাকা-খাওয়ার খরচও এই ঋণের মাধ্যমে মেটানো যাবে। তবে বিমান টিকিটের খরচ এই ঋণের আওতাভুক্ত হবে না।
আবেদনের যোগ্যতা
যারা বৈধভাবে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক, কেবল তারাই এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। উল্লেখ্য যে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীরা এই বিশেষ ঋণের সুবিধা পাবেন না।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো বৈধ মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিরা ব্যাংকের অভিবাসন ঋণ নীতিমালার আওতায় ঋণ পেতে পারেন।’
প্রয়োজনীয় নথিপত্র
ঋণের আবেদনের জন্য বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা, প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি এবং ভাষা বা দক্ষতা প্রশিক্ষণের যোগ্যতার সনদ দাখিল করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফার লেটার জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ওই অফার লেটারে টিউশন ফি, প্রশিক্ষণের সময়সীমা এবং থাকা-খাওয়ার খরচ কে বহন করবে—সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ থাকতে হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া
আগ্রহীরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্র প্রথমে সংশ্লিষ্ট শাখা পর্যায়ে যাচাই করা হবে এবং এরপর আবেদনটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদন হলে সংশ্লিষ্ট শাখায় অনুমোদনপত্র পাঠানো হবে।
ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে শাখায় উপস্থিত হয়ে ঋণ গ্রহণের সম্মতি প্রদান করতে হবে। তবে প্রাথমিক আবেদনের জন্য শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই; অনলাইনে আবেদনের পর আবেদনকারী নিজেই তাঁর আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
বিতরণের বর্তমান অবস্থা
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত মোট ৪৮১ জনকে ১৩ দশমিক শূন্য ৩ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
তদারকি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং
ঋণের অর্থ যাতে কেবল নির্ধারিত কাজেই ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে দুই স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশালস প্রোগ্রাম বিভাগ এই পুরো তহবিলের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করবে।