জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডায় পুলিশের গুলিতে শহীদ কিশোর ইমন (১৪)। তাঁর মৃত্যুর করুণ কাহিনী এবং লাশ পাওয়ার পর যে ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ সাক্ষ্য দিয়ে বর্ণনা করেছেন ইমনের মা কুলসুম বেগম। বুধবার ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তাঁর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এক বুকফাটা আর্তনাদ এবং নির্মমতার চিত্র।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাক্ষী হিসেবে হাজির হন কুলসুম বেগম। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বিকেলে তাঁর ছেলে ইমন বন্ধু নাঈম ও শাহীনের সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়। তারা উত্তর বাড্ডার এম জেড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলতলার মোড়ে চলমান আন্দোলনে যোগ দেয়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর শাহীন এসে ইমনের বড় ভাই রাজীবকে জানান যে, ইমন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এই দুঃসংবাদ পেয়ে কুলসুম বেগম তাঁর স্বামী ও বড় ছেলেকে নিয়ে দ্রুত তেঁতুলতলার মোড়ে ছুটে যান। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় ছেলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে তিনি জ্ঞান হারান।
জ্ঞান ফেরার পর কুলসুম বেগম নিজেকে বাসায় আবিষ্কার করেন এবং দেখেন যে তাঁর ছেলের নিথর দেহ বাসার সামনেই রাখা হয়েছে। জবানবন্দিতে তিনি সেই মুহূর্তের বিভীষিকা বর্ণনা করে বলেন, ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেখেন পেছনের খুলিতে ছোট একটি ছিদ্র। বাঁ গালের চামড়া ইঁদুরের গর্তের মতো হয়ে ঝুলে আছে এবং বুকের এক পাশে গুলির চিহ্ন। ঠিক সেই সময়ে লম্বা চুলওয়ালা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একজন ব্যক্তি সেখানে এসে তাঁকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘লাশ পেয়েছেন কাঁদতে পারবেন না, না হলে লাশ গায়েব করে দিব।’
ছেলের লাশ দাফন করার প্রক্রিয়াটি যে কতটা কষ্টকর ছিল, তা-ও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন কুলসুম বেগম। তিনি জানান, তাঁর বড় ছেলে রাজীব এলাকার একটি মসজিদে লাশ বহনের জন্য খাটিয়া চাইতে গেলে তা দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে অন্য একটি মসজিদ থেকে খাটিয়া এবং গোসল করানোর লোক এনে ইমনের গোসল সম্পন্ন করা হয়। জানাজা শেষ করে রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ছেলের লাশ নিয়ে ভোলার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। তবে সেই যাত্রাপথ ছিল বাধাগ্রস্ত। পথে তিন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাশ নিয়ে যেতে বাধা প্রদান করেন। অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর তাঁরা সেখান থেকে ছাড় পান এবং পরদিন ভোলায় ইমনকে দাফন করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে কুলসুম বেগম তাঁর প্রিয় সন্তান হত্যার জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামকে সরাসরি দায়ী করে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই মামলার আসামি রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে বন্দী রয়েছেন।