বিদেশের মাটিতে অন্তত ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি যাত্রীকে সেবা দেওয়ার মতো নিজস্ব বিমান বহর গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির capacity-তে বক্তব্য প্রদান করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি এই চুক্তির মাধ্যমে দেশের বিমান চলাচলের সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ যাত্রী বাংলাদেশ বিমানের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। আর বাকি ৮০ শতাংশ যাত্রী অন্যান্য এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেন। তাই আমি মনে করি, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই চুক্তিটি অত্যন্ত সফল একটি পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে আমাদের উড়োজাহাজের বহর আরও প্রসারিত হবে এবং বিদেশের মাটিতে অন্তত ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি যাত্রীকে সেবা দেওয়ার মতো নিজস্ব বহর তৈরি হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ১০টি এয়ারবাস সংগ্রহের এই প্রক্রিয়াটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য একটি টেকসই মিশ্র বহর তৈরির পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নতুন প্রজন্মের এই উড়োজাহাজগুলো বিমানকে বাজারের চাহিদা এবং রুটের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও দক্ষ ও সক্ষম করে তুলবে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমানে বহরের সীমাবদ্ধতার কারণে যাত্রীদের চাহিদা পূরণে সমস্যা হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী এয়ারবাসের সভাপতির প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, অন্তত একটি উড়োজাহাজ ২০২৬ সাল অথবা ২০২৮ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হোক। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি অনুরোধ।”
রশিদুজ্জামান মিল্লাত আরও বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আমরা চাই বিমান সেরা বিমান সংস্থাগুলোর একটি হয়ে উঠুক, অবশ্যই এয়ারবাস ও বোয়িং—উভয়ের সঙ্গেই। তাই সঠিক অবকাঠামো ও পরিচালন দক্ষতার সমর্থনে সঠিক নেটওয়ার্কের জন্য উপযুক্ত বহর তৈরি করা আমাদের প্রয়োজন।”
ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের উদ্দেশে মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশে একটি ‘মেনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল’ (এমআরও) কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, নতুন এয়ারবাস বহরকে শক্তিশালী করবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, শুধু উড়োজাহাজ দিয়ে একটি এয়ারলাইনকে দুর্দান্ত করা যায় না; তা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই করতে হবে। বিমানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাঁদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার ওপর।
তিনি আরও বলেন, “আপনাদের দেওয়া প্রতিটি সেবা, পরিচালিত প্রতিটি ফ্লাইট এবং নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। আমি আপনাদের অনুরোধ করব আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে এই নতুন অধ্যায়কে গ্রহণ করার জন্য।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর বলেন, “আজ আমি একযোগে বাংলাদেশ সরকার, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিমান ও বিশেষ করে এয়ারবাসকে এই দারুণ মাইলফলকে পৌঁছানোর জন্য অভিনন্দন জানাই।”
ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিস্তিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেত্রু বলেন, এয়ারবাসের সদস্য হিসেবে এখানে প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপের চারটি দেশের জন্য, ইউরোপীয় শিল্প খাত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অংশীদার ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকতে চায়। কঠিন সময়ে তারা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং বাংলাদেশ তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদার করতে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে স্পেনের রাষ্ট্রদূত বলেন, “আজকের চুক্তি স্বাক্ষর একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর বাংলাদেশের আস্থার চমৎকার উদাহরণ।” তার বিশ্বাস, এটি অদূর ভবিষ্যতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সহায়তা করবে।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও ভালোভাবে যুক্ত করতে একটি প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় এয়ারলাইন গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা বাংলাদেশ করছে, তাকে তাঁরা স্বাগত জানান। তিনি বলেন, “এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু নতুন ও প্রতিযোগিতামূলক উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।” ফ্রান্স আধুনিকায়ন ও প্রবৃদ্ধির পথে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত, যার মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরও রয়েছে। আগামী বছরগুলোতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা আরও জোরদার করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জার্মান রাষ্ট্রদূত এইচ. ই. রুডিগার লোটজ বলেন, এটি ইউরোপ ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও একটি মাইলফলক। ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বড় বিনিয়োগ। তবে তারা এটিকে এমন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, যার প্রভাব আগামী বহু বছর থাকবে।
তিনি বলেন, “এটি কেবল একটি চুক্তির সমাপ্তি নয়; আমি মনে করি, এটি একটি নতুন শুরুর সূচনা।” উড়োজাহাজগুলো বাংলাদেশে পৌঁছালে তা শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত গভীর সম্পর্কের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠবে।
ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার এইচ. ই. সারাহ কুক বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় যুক্তরাজ্য পূর্ণ সমর্থন জানায়।
তিনি আরও বলেন, বিমান চলাচল সহযোগিতা শক্তিশালী করতে এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা বিমান, এয়ারবাস ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের রপ্তানি ঋণ সংস্থাগুলোও এই চুক্তিকে সমর্থন করছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এয়ারবাস ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকার, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও এয়ারবাসের বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তির বিস্তারিত অনুযায়ী, মোট ১০টি উড়োজাহাজের মধ্যে চারটি এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও কেনা হবে। এর মধ্যে এ৩৫০-৯০০ দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং এ৩২১নিও আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের উপযোগী।