বিদেশি রপ্তানিমুখী বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতি করছে বর্তমান সরকার বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার দাবি, সরকার পুরো দেশকে দলীয়করণ করেছে এবং সব খাতেই সিন্ডিকেট সক্রিয়। তিনি অভিযোগ করেন, তেলের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যার ফলে পেট্রোল পাম্পে সাধারণ মানুষ তেল পায় না। তবে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথেই সব জায়গায় তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যায়। একইভাবে গ্যাসের দাম বাড়লে গ্যাসের সংকট দূর হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে নড়াইলের লোহাগড়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস লোহাগড়া শাখার উদ্যোগে একটি নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। উক্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির capacity-তে বক্তব্য প্রদানকালে মাওলানা মামুনুল হক এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের এক অংশে তিনি বলেন, “গ্যাসের দাম, তেলের দাম বাড়ানোর জন্য সিন্ডিকেট করে বাংলাদেশের কোটি মানুষকে জিম্মি করে আজকে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার নীতি অবলম্বন করছে।”
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, এই খাতের উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পণ্য রপ্তানি করতে হয়। কিন্তু দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকটের কারণে গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদনের খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি মন্তব্য করেন যে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের ফলে গার্মেন্টস খাতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি যথাযথভাবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
মাওলানা মামুনুল হক আরও বলেন, অন্যান্য দেশগুলো তাদের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি প্রদান করে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে রাখছে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিযোগিতা করা কঠিন করে তুলছে।
জুলাই সনদ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কেবল একটি দলের পরিবর্তে অন্য একটি দলের ক্ষমতায় আসা ছিল না। বরং আন্দোলনের শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রমুক্ত এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
তিনি জানান, ৩৩টি রাজনৈতিক দল নয় মাস ধরে ৮৩টি অধিবেশনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে। এই সনদে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ এবং একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন সময় এসেছে এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করার।
গণভোটের রায় প্রসঙ্গে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, একই দিনে একই নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে দুই ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, নির্বাচনের পর সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।”
গণভোটের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের দেওয়া রায়কে উপেক্ষা করা হলে জনগণই তার জবাব দেবে।
জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, দেড় হাজারের মতো মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।
এই নাগরিক সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শরাফত হোসাইন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নিয়ামতুল্লাহ কাসেমী, মজলিসে শুরা সদস্য মুফতি আব্দুর রহমান, মুফতি ফারুক হাসান নদভী, মুফতি শুয়াইব ইব্রাহীম, মাওলানা বেলায়েত হোসাইন, মাওলানা মনিরুজ্জামান এবং মাওলানা মাসুম বিল্লাহসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।