বর্তমান সময়ে সফল ব্যক্তিদের দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে প্রচুর আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। কেউ মনে করেন দ্রুত ঘুমানোই সফলতার চাবিকাঠি, কেউ নিয়মিত জার্নাল লেখার ওপর গুরুত্ব দেন, আবার কেউ বড় স্বপ্ন দেখার কথা বলেন। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের সফল জীবনের রহস্যটি কী ছিল, তা নিয়ে খুব কমই ভাবা হয়।
নবুয়তের প্রাথমিক দিনগুলোতে মহানবী (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ বারবার এসেছে, তা হলো রাতের ইবাদত বা কিয়ামুল লাইল। যিনি সারাদিন মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, তাঁকে অন্য সব ইবাদতের চেয়ে রাতের ইবাদতে কেন এত গুরুত্ব দিয়ে বলা হলো? এর কারণ হলো, দিনের বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্য যে মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রয়োজন হয়, সেই শক্তি মূলত তৈরি হয় রাতের ইবাদতের মাধ্যমে।
রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদত করাই ছিল আল্লাহর প্রাথমিক নির্দেশগুলোর অন্যতম। আল্লাহ-তাআলা ইরশাদ করেছেন, “হে বস্ত্রাবৃত, রাতে দাঁড়াও, তবে অল্প সময় বাদে। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে।” (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪)
এই আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে ‘মুজ্জাম্মিল’ বলে সম্বোধন করেছেন, যার অর্থ হলো যিনি কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেন। ওহির প্রথম অভিজ্ঞতার পর মহানবী (সা.) যখন চাদর মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ-তাআলা তাঁকে জাগ্রত করে নামাজে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, আল্লাহ তাঁকে প্রথমেই জনসমাবেশে ভাষণ দিতে, যুদ্ধে যেতে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশ দেননি; বরং প্রথমেই বলেছেন রাতের ইবাদতে দাঁড়াতে।
এরপর আল্লাহ নির্দেশ দেন, “আর কোরআন ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে পাঠ করো।” এখানে ‘তারতিল’ শব্দের অর্থ কেবল সুন্দর সুরে পড়া নয়, বরং থেমে থেমে, অর্থ উপলব্ধি করে এবং হৃদয়ে অনুধাবন করে পড়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। রাতের সময়টি বেছে নেওয়ার কারণ জানিয়ে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই রাতের ইবাদত মনকে অধিক দৃঢ় করে এবং কথা ও উপলব্ধিকে অধিক সুদৃঢ় করে।”
মুফাসসিরদের মতে, দিনের ব্যস্ততায় মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে, কিন্তু রাতের নীরবতায় মন একাগ্র হয়। এই সময়ে দোয়া গভীর হয়, পাঠ হৃদয়ে গেঁথে যায় এবং আত্মা সহজেই আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরে আসে। আধুনিক পরিভাষায় বলা যায়, দিনের অসংখ্য নোটিফিকেশন, ব্যস্ততা আর কোলাহলের ভিড়ে যে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, রাত তাকে পুনরায় সজীব করে তোলে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) উল্লেখ করেছেন, “আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
এটি এমন এক অনন্য আমন্ত্রণ, যা পৃথিবীর কোনো সম্রাট তাঁর প্রজাদের কখনো দেননি। এরপর আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই দিনের বেলায় তোমার রয়েছে দীর্ঘ ব্যস্ততা।” অর্থাৎ দিন হলো কর্মতৎপরতার জন্য এবং রাত হলো আত্মার পুনর্গঠনের জন্য। যিনি রাতের এই আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে পারেন, দিনের প্রতিকূলতা তাঁকে সহজে দমাতে পারে না।
এরপর জীবনের আরেকটি মৌলিক শিক্ষা হিসেবে আল্লাহ-তাআলা বলেন, “তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করো এবং সম্পূর্ণভাবে তাঁরই দিকে মনোনিবেশ করো।” এর অর্থ এই নয় যে সংসার ত্যাগ করতে হবে, বরং সব কাজের মাঝে আল্লাহকে স্মরণ রাখতে হবে। যখন জীবন আল্লাহ-কেন্দ্রিক হয়, তখন জাগতিক চাপ ও ক্লান্তি হ্রাস পায়।
তবে সুরা মুজ্জাম্মিলের শেষাংশে আমাদের জন্য স্বস্তির বার্তা রয়েছে। শুরুতে দীর্ঘ রাতের ইবাদতের নির্দেশ থাকলেও পরবর্তীতে বান্দার সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে আল্লাহ বলেন, “অতএব কোরআন থেকে যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকুই পড়ো।” এটি আল্লাহর অসীম দয়ার বহিঃপ্রকাশ। তিনি কষ্ট নয়, বরং ইবাদতে ধারাবাহিকতা চান। তাই নবীজির মতো দীর্ঘ সময় নামাজে পড়া সম্ভব না হলে আন্তরিকতার সাথে অল্প সময় ইবাদত করাও যথেষ্ট।
একই আয়াতে আল্লাহ মনে করিয়ে দিয়েছেন, “তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো।” অর্থাৎ নফল ইবাদত কম হলেও ফরজ নামাজ, জাকাত এবং মৌলিক দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা করা যাবে না। সবশেষে আল্লাহ একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যা মুমিনের জন্য আশার আলো, “তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে আরও উত্তম ও আরও বড় প্রতিদান হিসেবে পাবে।”
ফজরের আধা ঘণ্টা আগে উঠে মাত্র দুই রাকাত নামাজ, কয়েকটি আয়াত পাঠ, কিছু ইস্তিগফার এবং মন খুলে আল্লাহর সাথে কথা বলা—কিছু আবেদন ও নিবেদন। আমরা অনেকেই মনে করি রাতের ঘুম কম হলে শরীরের ক্ষতি হবে, কিন্তু কোরআন শেখায় যে আল্লাহর জন্য ব্যয় করা সময় কখনো বৃথা যায় না। তা দুনিয়ায় প্রশান্তি এবং পরকালে অসীম পুরস্কার হিসেবে ফিরে আসে।
আল্লাহর নেতৃত্বের আলোয় আলোকিত হতে চাইলে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ আজ রাত থেকেই শুরু করা যেতে পারে। এর জন্য পুরো রাত জাগার প্রয়োজন নেই, দীর্ঘ তাহাজ্জুদও নয়। ফজরের আধা ঘণ্টা আগে উঠে মাত্র দুই রাকাত নামাজ, কয়েকটি আয়াত পাঠ, কিছু ইস্তিগফার, আর মন খুলে আল্লাহর সঙ্গে কিছু কথা বিনিময়। কিছু আবেদন, কিছু নিবেদন। নিশ্চয় সেই কয়েক মিনিটই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ হয়ে থাকবে। যেদিন পৃথিবীর সব হিসাব শেষ হবে, সেদিন এই সামান্য বিনিয়োগই অকল্পনীয় লাভ ও আনন্দ বয়ে আনবে।
—মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর, খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।