বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ব্যবহারকারী কোথায় কোথায় ভ্রমণ করেছেন, তা এখন এক ক্লিকেই মানচিত্রে দেখা যাবে। শুধু তাই নয়, নিজের নাম যুক্ত করে সেই মানচিত্রটি ডাউনলোড করার সুবিধাও রয়েছে এই অ্যাপে। পাশাপাশি চার-পাঁচটি জেলা নির্বাচন করলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজিয়ে দেবে। কোথায় আগে যেতে হবে, কোথায় থাকা যাবে, যাতায়াতের মাধ্যম এবং সম্ভাব্য খরচের হিসাব—সবই জানা যাবে এক জায়গায়। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ২৪০টিরও বেশি দর্শনীয় স্থানের বিস্তারিত তথ্যের পাশাপাশি এতে যুক্ত করা হয়েছে বিশ্ব মানচিত্র, কুইজ এবং ইন্টারেকটিভ গেম।
এমন একটি উদ্ভাবনী ওয়েব অ্যাপ তৈরি করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন মো. সাব্বির হোসেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে পেশায় তিনি একজন সফটওয়্যার ডিজাইনার।
সফটওয়্যার ডিজাইন, মোবাইল অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন সাব্বির। নিজের এই পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েই তিনি তাঁর ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দেন। শুরুতে এই ওয়েব অ্যাপটি ছিল কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। পরবর্তীতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি প্রথমবার এর ম্যাপ ফিচারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তবে প্রথমবার পোস্ট করার পর খুব একটা সাড়া পাননি তিনি।
সাব্বিরের তৈরি এই ‘আনসিন বাংলাদেশ’ ওয়েব অ্যাপটির জন্ম হয়েছিল তাঁর নিজস্ব প্রয়োজন থেকে। ভ্রমণপিপাসু সাব্বির নিজের কৌতূহল মেটাতে প্রথমে এআই ব্যবহার করে বাংলাদেশের একটি মানচিত্র তৈরি করেন। যেসব জেলা তিনি ঘুরেছেন, সেগুলো মানচিত্রে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তবে সেটি ছিল কেবল একটি স্থির ছবি। ফলে নতুন কোনো জেলা ভ্রমণের পর প্রতিবারই শুরু থেকে মানচিত্রটি পরিবর্তন করতে হতো।
এই সমস্যাটি নিয়ে সাব্বির বলেন, ‘আমি ভাবলাম, বিষয়টি যদি এমনভাবে করা যায়, ভ্রমণের জন্য কেউ নতুন কোনো জেলা বাছাই করলে সেটি আগের জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ম্যাপ তৈরি হবে। তাহলে সময় সাশ্রয় হবে। সেই ভাবনা থেকেই মূলত এই ওয়েব অ্যাপ বানানো শুরু।’
মানচিত্র নিয়ে কাজ করতে করতে সাব্বিরের ভাবনা আরও বিস্তৃত হয়। তিনি বাংলাদেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে কাজ করার কথা ভাবেন। তাঁর উপলব্ধি হয় যে, কক্সবাজার, রাঙামাটি বা বান্দরবানের মতো জনপ্রিয় জায়গার বাইরেও দেশে অনেক ছোট ও স্বল্প পরিচিত দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেগুলোর কথা অনেকেরই জানা নেই। এই সব জায়গার তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে ভ্রমণ আরও সহজ হবে।
সেই লক্ষ্যেই তিনি অ্যাপে ‘কোথায় ঘুরবেন’ নামক একটি অপশন যুক্ত করেন। এখানে ৬৪ জেলার পরিচিত ও অপরিচিত বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবি ও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। কোথায় যেতে হবে, যাতায়াত ব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা এবং সম্ভাব্য খরচের পাশাপাশি গাড়িভাড়ার তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। এমনকি কোথায় নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে কিংবা পার্কিং ও পাবলিক টয়লেটের সুবিধা আছে কি না, সেই খুঁটিনাটি তথ্যও এখানে যুক্ত করা হয়েছে।
এরপর তিনি যুক্ত করেন ‘ট্রিপ প্ল্যানার’ ফিচারটি। নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই এই সুবিধাটি নিয়ে আসেন তিনি। সাব্বির বলেন, ‘আমি নিজে অনেক সময় একসঙ্গে তিন-চারটি জেলা ঘুরি। তাই একজন ব্যবহারকারী কোন জেলায় আগে যাবেন, কোন জেলায় পরে যাবেন—এসব বিবেচনা করে একটি গোছানো ট্রিপ প্ল্যান তৈরি করার সুযোগ রাখা হয়েছে এখানে।’
পরবর্তীতে এই ওয়েব অ্যাপে বিশ্ব মানচিত্র, কুইজ এবং ম্যাপভিত্তিক ছোট গেম যুক্ত করা হয়। ব্যবহারকারীরা কুইজে অংশ নিয়ে স্কোরসহ ফটোকার্ড তৈরি করতে পারেন এবং তা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে অন্যদের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। অ্যাপটি বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই ব্যবহার করা সম্ভব।
সবগুলো ফিচার যুক্ত করার পর গত শনিবার দ্বিতীয়বার ফেসবুকে পোস্ট করেন সাব্বির। এবারই পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং মানুষ নিজেদের ভ্রমণ মানচিত্র তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতে শুরু করে।
সাব্বিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সাত দিনে এই ওয়েব অ্যাপটিতে ২ কোটি ৪০ লাখ ভিজিট হয়েছে, যার মধ্যে ইউনিক ভিজিটরের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮০ হাজার। ওয়েবসাইটের লাইভ তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৮০৩ জন বাংলাদেশের মানচিত্র এবং ৪৫ হাজার ৫৩৮ জন বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেছেন। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল প্রকল্পের পেছনে কোনো বড় দল নেই; শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একাই পুরো অ্যাপটি তৈরি করেছেন সাব্বির। কোডিংয়ের কাজে তিনি এআই টুল ‘ক্লড কোড’ ব্যবহার করেছেন। ভাইরাল হওয়ার পরও ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন তিনি। তবে বর্তমানে ভ্রমণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গো-জায়ানের সঙ্গে একটি ব্র্যান্ড কলাবোরেশন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ট্রিপ প্ল্যানের সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের সেবার সংযোগ রাখা হয়েছে।
সাব্বির জানান, এই ওয়েব অ্যাপ তাঁর আয়ের প্রধান উৎস নয়। পেশায় সফটওয়্যার ডিজাইনার হিসেবে তিনি কাজ করছেন। এছাড়া লিথুয়ানিয়ার প্রতিষ্ঠান ব্রেভনের সঙ্গে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত আছেন এবং তাঁর নিজস্ব এজেন্সি ‘ডিজাইন মিঙ্গেল’ রয়েছে। এসব কারণে তিনি ওয়েব অ্যাপটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং বিজ্ঞাপন ছাড়াই চালু রাখতে চান।
ভবিষ্যতে ‘আনসিন বাংলাদেশ’-এ আরও কিছু নতুন সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন সাব্বির। বর্তমানে তিনি ‘ট্রাভেল পার্সোনালিটি’ ফিচার নিয়ে কাজ করছেন। ব্যবহারকারীর ভ্রমণের অভ্যাস ও পছন্দের ওপর ভিত্তি করে একটি ট্রাভেল পার্সোনালিটি কার্ড তৈরি হবে। এতে থাকবে বিভিন্ন অর্জনের ব্যাজ। যেমন—কেউ ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করলে পাবেন বিশেষ ব্যাজ, আবার নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের বেশি জেলা ভ্রমণ করলেও মিলবে আলাদা স্বীকৃতি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সাব্বির। তিনি বিভাগীয় ক্রিকেট দলের মূল একাদশে ফাস্ট বোলার হিসেবে খেলেছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন তিনি। নোয়াখালী জেলায় তাঁর বাড়ি হলেও পরিবারের সঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম নগরে থাকেন।
২০২০ সালে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় আইটি খাতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ২০২২ সালের শুরুর দিকে পড়াশোনা শেষ করার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েই তিনি নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাব্বির বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আমার তেমন কাজে লাগছে না। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন দক্ষতা শেখা জরুরি। শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে এআই ও অটোমেশন কাজে লাগিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা এবং সেই দক্ষতা দিয়ে আয় করার চেষ্টা করা উচিত।’
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে সাব্বির বলেন, ‘এআইকে শুধু ছবি তৈরি বা লেখালেখির টুল হিসেবে না দেখে কাজের দক্ষতা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। শুধু টিউশনের পেছনে না ছুটে দক্ষতা অর্জন করে সেই দক্ষতা কাজে লাগানো উচিত। এতে আয় করার পাশাপাশি নিজের কাজের একটি ভালো পরিচয় তৈরি করা যায়।’