ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের এক অনন্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন, ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হলে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই আগুনের কবলে পড়ে সিনেমা হলের পাশাপাশি সংলগ্ন আরও ১৫ থেকে ২০টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

গতকাল দিবাগত রাত সোয়া দুইটার দিকে আগুনের খবর পেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় ফায়ার সার্ভিস। মোট চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এই অগ্নিকাণ্ডে মোট কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি।

ঘটনা প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, “আগুনে সিনেমা হলসংলগ্ন এলপিজি সিলিন্ডারের গোডাউন, ডেকোরেশন ও পুরোনো কাপড়ের দোকানসহ ১৫ থেকে ২০টি দোকান পুড়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সিলিন্ডারের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তদন্তের পর আগুনের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, ঝলমল সিনেমা হলের এই ভবনটি আদিতে একটি নাট্যমঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে গৌরীপুর রাজপরিবারের বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন কলকাতার বিখ্যাত স্টার থিয়েটারের আদলে এই নাট্যমঞ্চটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠার পর এই মঞ্চে প্রথম ‘শাহজাহান’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। পরবর্তী সময়ে দেশের নামকরা শিল্পী ও গুণীজনেরা এই মঞ্চে তাদের অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তবে পাকিস্তান আমলে স্থাপনাটি সরকারি মালিকানায় চলে যাওয়ার পর এখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কার্যক্রম শুরু হয়।

সময়ের আবর্তনে এই স্থাপনাটির নাম একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। শুরুতে এটি ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল, পরবর্তীতে নাম বদলে হয় ‘প্রতিমা সিনেমা হল’ এবং সবশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

গৌরীপুরে প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার কাজ করা রায়হান উদ্দিন সরকার এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আগুনে ভবনটির ক্ষয়ক্ষতি শুধু একটি পুরোনো সিনেমা হল হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে গৌরীপুরের নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে।”