চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি ও ভিডিও ধারণের পাশাপাশি গণমাধ্যমে বন্দরের ‘অপারেশনাল তথ্য’ প্রকাশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। নতুন এক নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া এ ধরনের তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা ‘সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত’ এবং এটি ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের স্বাক্ষরিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। এই বিধিনিষেধের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং মূলধারার গণমাধ্যম—সবগুলোকেই সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নির্দেশনায় ‘অপারেশনাল তথ্য’ বলতে ঠিক কোন বিষয়গুলোকে বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এর ফলে বন্দরের নিয়মিত কার্যক্রম যেমন—জাহাজের আসা-যাওয়া, কনটেইনারের ওঠানামা, পণ্য খালাসের গতিপ্রকৃতি, বন্দরের জট, টার্মিনালের সক্ষমতা কিংবা উৎপাদনশীলতার মতো তথ্যগুলো, যা সাধারণত নিয়মিত প্রকাশিত হয়, সেগুলোও কি এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা, নজরদারি সক্ষমতা, স্থাপনার বিন্যাস ও অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা গ্রহণযোগ্য নয়।”

বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই নির্দেশনা এলো, যখন চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র আন্দোলন চলছে। এই প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত ৫ অক্টোবর বন্দর রক্ষা কমিটি বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এই চুক্তি কার্যকর হলে তারা বন্দর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ক’ শ্রেণির কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন বা কেপিআই। তাই এর নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সংবেদনশীল স্থাপনার সুরক্ষা সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত। সম্প্রতি দেখা গেছে, অনেকে বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে প্রকাশ করছেন, এমনকি সরাসরি সম্প্রচারও করছেন। এতে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ফলে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, “কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা, নজরদারি সক্ষমতা, স্থাপনার বিন্যাস ও অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা গ্রহণযোগ্য নয়।” একই সাথে বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নজরদারি ও যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ছবি, ভিডিও, স্কেচ বা দৃশ্যমান তথ্য অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ ও প্রচার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশনায় সতর্ক করা হয়েছে যে, অনুমোদন ছাড়া তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের ফলে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই বিধিনিষেধের আইনি ভিত্তি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২’-এর ১২ ধারা এবং ১৯২৩ সালের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর কথা উল্লেখ করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ আইনের ১২ ধারার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বন্দরের সুষ্ঠু পরিচালনা ও সর্বসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য বন্দরসীমার সব স্থান ও স্থাপনাকে সংরক্ষিত বন্দর এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।” তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাটি মূলত বন্দর এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত, সংবাদমাধ্যমে সাধারণ কার্যক্রম বা অপারেশনাল তথ্য প্রকাশের ওপর সামগ্রিক বিধিনিষেধ দেওয়ার বিষয়টি এখানে স্পষ্টভাবে বলা নেই।

অন্যদিকে, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল স্থান, তথ্য, নকশা, ছবি বা অন্য উপাত্ত অনুমতি ছাড়া ধারণ, প্রকাশ বা প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, বন্দরের কোন স্থাপনা বা কোন তথ্যগুলো সংবেদনশীল হিসেবে গণ্য হবে, তার সীমারেখা কোথায়। বিশেষ করে জাহাজ আসা-যাওয়া, কনটেইনার ওঠানামা, পণ্য খালাস, জট, উৎপাদনশীলতা, টার্মিনালের সক্ষমতা কিংবা পরিচালন পরিস্থিতির তথ্য নিয়মিতভাবেই বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নতুন নির্দেশনায় ব্যবহৃত ‘অপারেশনাল তথ্য’ শব্দের মধ্যে এসব তথ্যও পড়বে কি না, তা পরিষ্কার করা হয়নি।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সম্প্রতি বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারও করছেন। এতে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই নির্দেশনাটি দেওয়া হয়েছে।”

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে কেন এই বিধিনিষেধ দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই নির্দেশনায় গণমাধ্যমের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ, গণমাধ্যম সব সময় বন্দরের অনুমতি নিয়েই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। গণমাধ্যমের তথ্য ও ছবি প্রকাশে কখনো সমস্যা হয়নি, হবেও না।”

তবে নির্দেশনায় শুধু সংরক্ষিত এলাকায় ছবি বা ভিডিও ধারণের কথা বলা হয়নি, বরং গণমাধ্যমে ‘অপারেশনাল তথ্য’ প্রকাশের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দেখছেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শত বছরের পুরোনো আইনের দোহাই দিয়ে বন্দর যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা গণমাধ্যমকে আটকানোর কৌশল। নিরাপত্তার বিষয়টি অজুহাত। বন্দর যদি একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে এটি করে, তাহলে সরকারের ওপরও এর দায় বর্তাবে। সুতরাং সরকারকে এ বিষয়ে সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”