উপমা যদি প্রাত্যহিক জীবনঘনিষ্ঠ হয়, তবে দুটো জিনিসের মাঝে সংযোগ করার কাজটিও সহজ হয়ে যায়। এ কারণে নবীজি (সা.) হরহামেশাই নানা রকমের উপমার ব্যবহার করতেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ খুব তাড়াতাড়ি ধর্মীয় বিধিবিধান ও নৈতিক বিষয়ের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারত।
এখানে কয়েকটি উপমা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা আমাকে যে হেদায়েত ও জ্ঞান (ইলম) দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার উদাহরণ হলো কোনো এক ভূখণ্ডে বর্ষিত প্রবল বৃষ্টির মতো:
১. সেই ভূখণ্ডের কিছু অংশ ছিল উর্বর। সেই অংশ পানি শুষে নিল, ফলে প্রচুর ঘাসপাতা এবং সবুজ তরুলতা জন্মাল।
২. কিছু কিছু অংশ ছিল শক্ত। সেই অংশ পানি ধরে রাখল, ফলে আল্লাহ সেই পানি দিয়ে মানুষকে উপকৃত করলেন; তারা (মানুষ) নিজেরা পান করল, পশুকে পান করাল এবং চাষাবাদ করল।
৩. আবার কিছু কিছু অংশ ছিল সমতল বা মরুভূমি। সেই অংশ না পানি আটকে রাখে, আর না কোনো ঘাস-লতাপাতা উৎপাদন করে।
এটি হলো সেই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দীনের গভীর জ্ঞান (ফিকহ) অর্জন করেছে, আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা থেকে নিজে উপকৃত হয়েছে, শিখেছে এবং অন্যকে শিখিয়েছে। আর তার বিপরীত দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির, যে এসবের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেয়নি এবং আল্লাহর যে হেদায়েত নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তা গ্রহণ করেনি। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৮২)
এই হাদিসে নবীজি (সা.) তিন ধরনের মানুষের কথা বলেন। এক ধরনের মানুষ হলো যাঁরা চিন্তাশীল, প্রতিটি বিষয়কে গভীরভাবে বোঝেন ও মানেন। আরেক ধরনের মানুষ হলো যাঁরা মেধাবী, মুখস্থশক্তি প্রবল, কিন্তু বিষয়ের গভীরে যেতে পারেন না।
এই দুই ধরনের মানুষ হেদায়েত ও জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। কিন্তু যারা অজ্ঞ ও অহংকারী, যাদের চিন্তাভাবনা নিবর্তনমূলক, তারা কখনো হেদায়েত পায় না, জ্ঞানও হাসিল করতে পারে না।
বৃষ্টি ও মাটির উদাহরণ দিয়ে এই বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে তিনি বুঝিয়েছেন।
একদিন নবীজি (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এমন একটি গাছ আছে, যেই গাছের পাতা কখনো ঝরে পড়ে না। সেই গাছটি মুমিনের মতো। বলতে পারেন, সেটি কোন গাছ?’
সাহাবিরা মরুভূমির বিভিন্ন গাছের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। কিন্তু উত্তর দিতে পারলেন না। তখন তাঁরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনিই বলে দিন সেটি কোন গাছ?’
নবীজি (সা.) বললেন, ‘সেই গাছটি হলো খেজুরগাছ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩১; তিরমিজি, হাদিস: ২,৮৬৭)
আরব অঞ্চলে খেজুরগাছের প্রতিটি অংশকেই কাজে লাগানো হয়। খাবার হিসেবে খেজুর তো আছেই, সেই সঙ্গে গুড়, সিরকা ও নাবিজ—এ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য এবং বীজ থেকে কফিজাতীয় পানীয় হয়।
পাতা দিয়ে ঘরের চাল, বাড়ির বেড়া, মাদুর, হাতপাখা, বড় ঝুড়ি ও নানা ধরনের পাত্র; কাণ্ড দিয়ে ঘরের খুঁটি, দরজার পাল্লা ও বিভিন্ন গৃহ সরঞ্জাম; আঁশ দিয়ে রশি ও বালিশ ইত্যাদি; অবশিষ্টাংশ থেকে রান্নার জ্বালানি ও পশুখাদ্য তৈরি করা হয়।
এককথায় খেজুরগাছ একজন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো কাজে লাগে। এই জন্যই নবীজি (সা.) মুমিনকে খেজুরগাছের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেন মুমিনও নিজেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উপকারী প্রমাণ করতে পারে।
আরেক হাদিসে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে নবীজি (সা.) বলেন, ‘মুমিনের উদাহরণ হলো খেজুরগাছের মতো। আপনি সেখান থেকে যা-ই গ্রহণ করুন না কেন—তা আপনার উপকারে আসবে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস: ৫,৮৪৮)
আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন—আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা নিয়ে আশঙ্কা করি, তা হলো—একসময় আল্লাহ তোমাদের সামনে পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দেবেন।’
সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘পৃথিবীর বরকত বলতে কী উদ্দেশ্য?’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘দুনিয়ার চাকচিক্য।’
এ কথার পর এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, ‘কল্যাণ কি কখনো অকল্যাণ বয়ে আনতে পারে?’
এ প্রশ্নে নবীজি (সা.) কিছুক্ষণ নীরব রইলেন, এমন নীরব যে আমরা মনে করলাম—হয়তো ওহি নাজিল হচ্ছে। এরপর তিনি কপাল থেকে ঘাম মুছলেন এবং বললেন, ‘প্রশ্নকারী কোথায়?’
সেই সাহাবি বললেন, ‘আমি।’
আবু সাইদ (রা.) বলেন, তখন আমরা সেই প্রশ্নকারীর প্রশংসা করলাম, কারণ তাঁর প্রশ্নের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এল।
নবীজি (সা.) বললেন, ‘কল্যাণ কেবল কল্যাণই বয়ে আনে। নিশ্চয় এই ধনসম্পদ খুবই আকর্ষণীয় ও মধুর জিনিস। কিন্তু বসন্তকালে যেমন অতিরিক্ত ঘাস খাওয়ার কারণে অনেক পশু মারা যায় কিংবা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। তবে যে পশু পরিমাণমতো খায়, যখন পেট ভরে গিয়ে দুই পার্শ্ব ফুলে ওঠে, তখন সূর্যের দিকে দাঁড়িয়ে জাবর কাটে, মলমূত্র ত্যাগ করে আবার খায়, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
(এরপর তিনি বললেন,) এই সম্পদও ঠিক সেই রকম। যে ব্যক্তি সৎভাবে সম্পদ উপার্জন করবে এবং সৎ জায়গায় তা খরচ করবে, তার সম্পদ তার জন্য খুবই উপকারী হবে। আর যে ব্যক্তি অসৎ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করবে, সে এমন মানুষের মতো হবে—যে খেতেই থাকে, কিন্তু কখনো পরিতৃপ্ত হয় না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪২৭)
ধনসম্পদ মন্দ জিনিস নয়, এর মাঝেও বরকত ও কল্যাণ আছে। কিন্তু কল্যাণকর জিনিসও যে ক্ষতির কারণ হতে পারে, এর উদাহরণ হিসেবে চতুষ্পদ প্রাণীর অতিভোজনের কথা উল্লেখ করা ছিল নবীজির (সা.)–এর অনুপম দূরদর্শিতা।
কারণ, সাহাবিদের একটি বড় অংশই ছিল কৃষক, এবং প্রাণীদের এই চরিত্রের কথা প্রায় সবাই জানতেন। তাই এমন একটি জটিল দার্শনিকতাপূর্ণ বিষয়কে বোঝাতে এমন উপমাই ব্যবহার করেন, সাধারণ মানুষ যার প্রত্যক্ষদর্শী।
আর এই উপমা প্রয়োগের জন্য প্রাণ ও প্রকৃতিকে যে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন, নবীজি (সা.) তা যথাযথভাবেই করেছিলেন।
[email protected]
মওলবি আশরাফ : আলেম, লেখক ও অনুবাদক






