আতিকা বিনতে জায়েদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের এক অনন্য ও বিদুষী সাহাবি। রূপ-সৌন্দর্য, ধার্মিকতা, প্রজ্ঞা, সাহিত্যবোধ ও বুদ্ধিমত্তার এমন সমন্বয় তৎকালীন সমাজে খুব কমই দেখা যেত।

তৎকালীন আরবে প্রাঞ্জলভাষী ‘কবি’ হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। পাশাপাশি একজন একনিষ্ঠ ‘মসজিদপ্রেমী’ নারী হিসেবেও তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। আনুমানিক ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কোরাইশ বংশের বনু আদি গোত্রে তাঁর জন্ম। (ইবনে সাদ, আত–তাবাকাত আল–কুবরা, ৮/২৩০, দার ছাদের, বৈরুত)

তিনি ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেই ইমান আনেন এবং মদিনায় হিজরতের গৌরব অর্জন করেন।

.
ইসলামি সমাজে বিধবা নারীদের পুনর্বাসন ও সম্মানজনক পুনর্বিবাহের যে সহজ ও কুসংস্কারমুক্ত আবহ ছিল, আতিকার জীবন তার এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।
.

আতিকার পিতা জায়েদ ইবনে আমর এবং মাতা উম্মে কুরজ সাফিয়া বিনতে আল-হাদরামি। তাঁর পিতা জাহেলি যুগেই পৌত্তলিকতা বর্জন করে একত্ববাদী (হানিফ) ছিলেন এবং নবী ইব্রাহিমের বিশুদ্ধ তাওহিদের ওপর অবিচল ছিলেন।

কোরাইশদের উদ্দেশ্য করে তিনি প্রকাশ্যে বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমাদের মধ্যে একমাত্র আমিই ইব্রাহিমের সত্য ধর্মে প্রতিষ্ঠিত। (সিরাত ইবনে হিশাম, ১/২৩৫)

আতিকার ভাই সাইদ ইবনে জায়েদ (রা.) ছিলেন ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’ তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির অন্যতম। আর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই।

.

তাঁর উপাধি ছিল ‘জাওজাতুশ শুহাদা’ বা ‘শহীদদের স্ত্রী’। বিভিন্ন সময়ে তাঁর পাঁচটি বিবাহ হয় এবং তাঁর পাঁচজন স্বামীই ছিলেন শীর্ষস্থানীয় সাহাবি, যাঁরা প্রত্যেকেই শাহাদতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

ইসলামি সমাজে বিধবা নারীদের পুনর্বাসন ও সম্মানজনক পুনর্বিবাহের যে সহজ ও কুসংস্কারমুক্ত আবহ ছিল, আতিকার জীবন তার এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।

.ইসলামের প্রথম নারী শহীদ.

প্রথম বিবাহ: তাঁর প্রথম বিবাহ হয় চাচাতো ভাই জায়েদ ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে, যিনি ছিলেন খলিফা ওমরের বড় ভাই। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

দ্বিতীয় বিবাহ: ইদ্দত শেষে প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকের পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.) তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রস্তাব দিলে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তিনি তায়েফ অবরোধকালে তিরের মারাত্মক আঘাতে আহত হয়ে পরে ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে শাহাদত বরণ করেন।

তৃতীয় বিবাহ: পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে তাঁর তৃতীয় বিবাহ হয়। তাঁদের ঘরে ‘ইয়াজ’ নামে এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ওমর (রা.) ফজরের নামাজে আততায়ীর ছুরিকাঘাতে শহীদ হন।

.
একের পর এক স্বামীর শহীদ হওয়ার ঘটনার কারণে মদিনাবাসীদের মুখে একটি চমৎকার কথা প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল, “যে ব্যক্তি শহীদ হতে চায়, সে যেন আতিকাকে বিবাহ করে।’
.

ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, খলিফা ওমর যেদিন আঘাতপ্রাপ্ত হন, সেদিনও পেছনের কাতারে নামাজে তাঁর স্ত্রী আতিকা উপস্থিত ছিলেন। (আল-ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবাহ, ৮/২২৮)

চতুর্থ বিবাহ: এরপর জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বীর সাহাবি জুবাইর ইবনুল আওয়ামের সঙ্গে তাঁর চতুর্থ বিবাহ হয়। ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে উটের যুদ্ধের পটভূমিতে জুবাইর (রা.) শহীদ হন।

পঞ্চম বিবাহ: পরে নবী দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলির সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ বিবাহ হয়। কারবালার ঐতিহাসিক প্রান্তরে তিনিও শহীদ হন। অবশ্য কারবালা ট্র্যাজেডির কয়েক বছর আগেই আনুমানিক ৬৭২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় আতিকা (রা.) ইন্তেকাল করেন।

একের পর এক স্বামীর শহীদ হওয়ার ঘটনার কারণে মদিনাবাসীদের মুখে একটি চমৎকার কথা প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল, “যে ব্যক্তি শহীদ হতে চায়, সে যেন আতিকাকে বিবাহ করে।’ (আত-তাবাকাত আল–কুবরা, ৩/৮৩)

.শহীদ হতে ব্যাকুল এক সাহাবি.

আতিকা বিনতে জায়েদ (রা.) ছিলেন আরবের এক অনন্য ‘শায়িরাহ’ বা স্বভাবকবি। আরবি সাহিত্যের ‘রিসা’ অর্থাৎ প্রিয়জনের মৃত্যুতে গভীর আবেগঘন শোকগাথা রচনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

নবীজির ওফাতের পর তিনি হৃদয়স্পর্শী শোককাব্য রচনা করেন। (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২/২৪৬)

পরবর্তী সময়ে স্বামী আবদুল্লাহ, ওমর ও জুবাইরের শাহাদতের বেদনায় রচিত তাঁর শোককবিতাগুলো সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াহ, ৭/১৮৯)

.
মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল অটুট। তাঁর এই শর্ত এতই অবিচল ছিল যে বিবাহের প্রস্তাব এলে তিনি আগেই জানিয়ে দিতেন, ‘মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া যাবে না।’
.

আতিকা (রা.) ছিলেন গভীর ইবাদতগুজার ও মসজিদপ্রেমী। মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল অটুট। তাঁর এই শর্ত এতই অবিচল ছিল যে বিবাহের প্রস্তাব এলে তিনি আগেই জানিয়ে দিতেন, ‘মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া যাবে না।’

ওমর কিংবা জুবাইর (রা.) উভয়েই তাঁর এই স্বাধীন ইচ্ছা ও শর্ত সানন্দে মেনে নিয়েছিলেন। (ইবনুল আসির, উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, ৭/১৮২)

পাঁচজন বীর শহীদের জীবনসঙ্গিনী হয়ে আতিকা বিনতে জায়েদ (রা.) যেমন অসীম ধৈর্য ও শোক বুকে ধারণ করেছেন, তেমনি সামাজিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নতুন উদ্যমে জীবন পরিচালনা করার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

ইতিহাস ও সাহিত্যের পাতায় তিনি চিরকাল এক প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবেন।

  • ড. সাজেদা হোমায়রা : শিক্ষাবিদ ও গ্রন্থকার

.ইসলামে শহীদ কী, মর্যাদা কেমন