মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে ২০০৮ সালের ৩১ মে প্রকাশিত ‘শায়েস্তা খাঁর এক টাকা’ শিরোনামে এ লেখাটি এত দিন শুধু ছাপা কাগজে ছিল, আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

ইতিহাসের পাতায় যাদের আগ্রহ নেই, তারাও প্রায়ই বলে থাকেন যে শায়েস্তা খাঁর আমলে মাত্র এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, জীবন কত সুখের ছিল সেই সময়ে। জনশ্রুতি এমন যে, শায়েস্তা খাঁর আমলে এক টাকায় এক সের বা এক মণ নয়, বরং আট মণ চাল পাওয়া যেত। বর্তমান সময়ের শাসকেরা যদি চোরচোট্টাদের শায়েস্তা করে টাকায় অন্তত এক ছটাক চালের ব্যবস্থা করতে পারতেন, তবে সাধারণ মানুষ ধন্য ধন্য রবে ফেটে পড়ত।

তবে একজন ইতিহাসচর্চাকার হিসেবে আমি বর্তমানকে পেছনে ফেলে সেই টাকায় আট মণের যুগে ফিরে তাকাতে চাই। তবে আমার দৃষ্টি হবে ক্রেতার দিকে নয়, বরং বিক্রেতার দিকে। সেই আমলের একজন কৃষক কত চাল হাটে নিয়ে গিয়ে কত টাকা পেতেন? ধরে নেওয়া যাক, শায়েস্তা খাঁর ব্যবস্থায় একজন কৃষক আট মণ চাল বিক্রি করে হাতে পেলেন এক টাকা। এখানে প্রশ্ন জাগে, চালের মূল্য বেশি ছিল নাকি টাকার? একজন কৃষককে একটি টাকা অর্জনের জন্য আট মণ চাল বিক্রি করতে হতো। এর অর্থ হলো, তাকে প্রথমে ১৬ মণ ধান উত্পাদন করতে হবে। ধানে চালের অনুপাত সবারই জানা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ১৬ মণ ধান উত্পাদনের পাশাপাশি তাকে সরকারের খাজনার জন্য আরও অতিরিক্ত ১৬ মণ ধান উত্পাদন করতে হতো; কারণ তখন জমির মোট উত্পাদনের প্রায় অর্ধেক সরকার খাজনা হিসেবে আদায় করে নিত।

তাছাড়া বছরব্যাপী পাওনাদারদের পরিশোধ করার জন্য কৃষককে আরও অন্তত ১৬ মণ অতিরিক্ত ধান উত্পাদন করতে হতো। সে যুগে মূলত ফসলের বিনিময়েই সারা বছরের বাকি শোধ করা হতো। ফসল ওঠার পরপরই হাজির হতো মুদিদোকানি, তাঁতি, পাটনি, নাপিত, কামার, কুমার এবং ছুতার—যারা সারা বছর তাকে বাকিতে পণ্য ও সেবা প্রদান করেছিল। এর পাশাপাশি ছিল বৈদ্যর ফি, ব্রাহ্মণের যজমানি এবং পীর-ফকিরদের মুষ্টিভিক্ষা। সবাইকে ধানের মাধ্যমে বিদায় করার পর কৃষকের নিজের খোরাকির জন্য যা অবশিষ্ট থাকত, তাতে সারা বছর নুন-ভাত চললে তা ছিল পরম ভাগ্যের কথা। খোরাকি অর্থনীতির এই ব্যবস্থায় একজন কৃষকের পক্ষে হাটে আট মণ চাল বিক্রি করে এক টাকার অধিকারী হয়ে ঘরে ফেরা ছিল এক অসাধারণ এবং বিরল কৃতিত্ব। আর যদি কেউ এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পারতেন, তবে তার প্রধান উদ্বেগ ছিল সেই টাকার নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ টাকাটির গন্ধ পেয়ে গেলে চোর-ডাকাত বা সরকারি পেয়াদা তা হাতিয়ে নিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকত।

তৎকালীন কৃষি উত্পাদন বাজারমুখী ছিল না, বরং ছিল খোরাকিমুখী। কৃষক বাজারের জন্য নয়, বরং নিজের খোরাকির জন্য উত্পাদন করত। প্রয়োজনীয় খোরাকি-ফসলের প্রায় সমপরিমাণ ফসল উত্পাদন করতে হতো সরকারের খাজনাপাতি এবং বছরব্যাপী নেওয়া পণ্য ও সার্ভিস ঋণ পরিশোধ করার জন্য।

এককথায় শায়েস্তা খাঁর যুগ সুখের ছিল বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানানো দরকার, “এই সুখ সাধারণ মানুষের নয়, এই সুখ উত্পাদক শ্রেণির নয়, এই সুখ কেবল শাসকশ্রেণির; এই সুখ এ দেশে আগত বিদেশিদের, যারা নগদ টাকার অধিকারী ছিল।”

মনে রাখতে হবে, ওই সময়কার কৃষি উত্পাদন বাজারমুখী ছিল না, ছিল খোরাকিমুখী। কৃষক উত্পাদন করত খোরাকির জন্য, বাজারের জন্য নয়। প্রয়োজনীয় খোরাকি-ফসলের প্রায় সমপরিমাণ ফসল উত্পাদন করতে হতো সরকারের খাজনাপাতি ও বছরব্যাপী নেওয়া পণ্য ও সার্ভিস ঋণ পরিশোধ করার জন্য।

খোরাকি অর্থনীতিতে নগদ টাকার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত। গ্রামের মানুষের চাহিদা গ্রামেই মেটানোর ব্যবস্থা সমাজ গড়ে তুলেছিল। তাঁতি, নাপিত, কামার, কুমার এবং শিক্ষকের মতো পেশাদাররা কৃষিপণ্যের বিনিময়ে তাদের সেবা প্রদান করতেন।

মোগল বাংলায় বাজারে পণ্য সস্তায় পাওয়া যেত—এই কথা আমরা মূলত বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ থেকে শুনি। ইবনে বতুতা, বার্নিয়ার এবং আরও অনেকে সস্তা পণ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে জানা দরকার, শুধু পণ্য নয়, মানুষও চালের মতো সস্তায় হাটে বিক্রি হতো। ইবনে বতুতা পরম খুশি হয়েছিলেন “এক টাকায় দুজন সুন্দরী মেয়ে কিনতে পেরে”।

একটি টাকার ক্রয়ক্ষমতা এতই বিশাল ছিল যে, গ্রামীণ মানুষের কাছে একটি পূর্ণ মূল্যের সিক্কা টাকা ছিল কেবল জনশ্রুতির বিষয়। পণ্যবিনিময় ছাড়া নগদ কেনাবেচা হতো মূলত কড়ির মাধ্যমে। গ্রাম পর্যায়ে কড়িই ছিল নগদ লেনদেনের প্রধান মাধ্যম। চালের মতোই কড়ি ছিল একটি পণ্য। দক্ষিণ ভারতের পূর্ব উপকূলীয় রাজ্য কর্ণাটকের কড়ির সঙ্গে বিনিময় হতো বাংলার চাল। পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলে কড়িকে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম করা হলো। কড়ির হিসাব ছিল এমন: ৪ কড়িতে ১ গন্ডা, ২০ গন্ডায় ১ পণ, ৪ পণে ১ আনা, ৪ আনায় ১ কাহন, ৪ কাহনে ১ টাকা। এখন বোঝা যায় এক টাকার অবস্থান কত উঁচুতে ছিল। যিনি একটি টাকার অধিকারী ছিলেন, তিনি সমাজে ‘টাকাওয়ালা’ হিসেবে সম্মানিত হতেন। তবে গ্রামে এমন টাকাওয়ালার সংখ্যা ছিল খুবই বিরল।

টাকার প্রচলন ছিল মূলত শহর ও বন্দরে, যেখানে পাইকারি কেনাবেচা হতো। শহরে যদি এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত, তবে গ্রামের হাটে চালের মূল্য আরও কত কম ছিল তা ভেবে দেখার বিষয়। গ্রামে টাকায় অন্তত ১৫ মণ চাল না মিললে শহর-বন্দরে তা আট মণে পাওয়ার কথা নয়।

মোগল বাংলায় বাজারে পণ্য সস্তায় পাওয়া যেত—এ কথা শুনি শুধু বিদেশি পর্যটকদের মুখে। ইবনে বতুতা, বার্নিয়ার ও আরও অনেকে বর্ণনা দিয়েছেন সস্তা পণ্যের। জানা দরকার, শুধু পণ্য নয়, মানুষও চালের মতো সস্তায় বিক্রি হতো হাটে। ইবনে বতুতা পরম খুশি হয়েছিলেন “এক টাকায় দুজন সুন্দরী মেয়ে কিনতে পেরে”।

যেহেতু খাদ্য আমদানি হতো না, তাই কোনো কারণে ফসলহানি হলে দুর্ভিক্ষ অনিবার্য হয়ে উঠত। তখন বেঁচে থাকার জন্য স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের দাস হিসেবে বিক্রি করতে হতো। খোরাকি অর্থনীতির কারণে মাঝেমধ্যেই আকাল ও দুর্ভিক্ষ স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। আবার অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন হলে কৃষিপণ্যের বাজার এতটাই মন্দা হয়ে যেত যে, গ্রাম পর্যায়ে এর মূল্য প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসত। অর্থাৎ, ফসলহানি হলে আসত খাদ্যাভাব আর বাম্পার ফসলের ফলে আসত টাকার অভাব। মধ্যযুগীয় সমাজের নিত্যসঙ্গী ছিল এই অভাব।

শায়েস্তা খাঁর যুগে ঢাকায় অনেক ইউরোপীয় বণিক ও ভ্রমণকারী এসেছিলেন। তাঁদের চোখে স্থানীয় বাজারের জিনিসের দাম ইউরোপের তুলনায় ছিল নিদারুণ সস্তা। তবে জিনিসের দাম সস্তা হওয়া যে প্রাচুর্য বা উচ্চ ক্রয়ক্ষমতার লক্ষণ নয়, তা পর্যটকেরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। অভিজাত শ্রেণি ছাড়া মধ্যযুগে নারী-পুরুষের প্রায় উলঙ্গ থাকা, খড়কুটো নির্মিত ঘরে থাকা এবং ভাতের জন্য নিজেকে বিক্রি করা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। শ্রমের বাজার এমন ছিল যে, শ্রমিককে পারিশ্রমিকের বদলে কেবল খাবার দিলেই তা যথেষ্ট মনে করা হতো এবং সেটাই ছিল প্রচলিত প্রথা। তাহলে তাদের পরিবারের ভরণপোষণ কীভাবে হতো? তাদেরও পেটেভাতে মজুরি বিক্রি করতে হতো।

মধ্যযুগের সমাজে মূলত চার শ্রেণির মানুষ ছিল—শাসকশ্রেণি, যাজকশ্রেণি, ভিক্ষুকশ্রেণি এবং কৃষক-মজুরশ্রেণি। শাসক, যাজক এবং ভিক্ষুক—সবাই হাত বাড়িয়েছিল কৃষকশ্রেণির উত্পাদনের ওপর। এই ব্যবস্থা সবচেয়ে শক্তিশালী হয় শায়েস্তা খাঁর আমলে, যখন জমির প্রায় অর্ধেক উত্পাদন খাজনা হিসেবে নেওয়া হতো। বিষয়টি অনুধাবন করতে কল্পনা করুন, আজকের সরকার যদি কৃষকের উত্পাদিত অর্ধেক ফসল রাজস্ব কর হিসেবে নিয়ে নেয়, তবে প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? সেকালের মানুষ তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। কারণ স্বৈরশাসন, বিদেশি শাসন এবং আভিজাত্যিক ও ধর্মীয় অনুশাসন উত্পাদক শ্রেণিকে একটি অসংগঠিত ও অসহায় শ্রেণিতে পরিণত করেছিল। অতএব, উচ্চ মূল্যের কথা বলতে গিয়ে যখন শায়েস্তা খাঁর আমলের এক টাকায় আট মণ চালের কথা বলা হয়, তখন কেবল টাকাওয়ালা ক্রেতার দিকটি লক্ষ্য না করে কপর্দকহীন কৃষক-শ্রমিকের করুণ অবস্থার কথা একবার ভেবে দেখা প্রয়োজন।