গান্ধীজয়ন্তীর বিশেষ এক অনুষ্ঠানে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েছেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত। জনপ্রিয় অভিনেতা ও টেলিভিশন সঞ্চালক শেখর সুমনের সঞ্চালনায় ‘শেখর টুনাইট’ নামক টক শো-তে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ভারতীয়রা অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ ও উদার হলেও বর্তমানে দেশে আগের মতো ‘শান্তি’ অনুভব করেন না তিনি। এই কথাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় তীব্র তর্কবিতর্ক। নেটিজেনদের একটি অংশ তাঁর বক্তব্যের সমর্থন করলেও অন্য একটি অংশ তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন।

বিতর্কের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় যখন অনুষ্ঠানের একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক পর্বে সঞ্জয় তাঁর আইকনিক ‘মুন্না ভাই’ চরিত্রের আদলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ভান করেন। সেখানে তিনি দেশের রাজনীতি, মহাত্মা গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে বিভিন্ন রসিকতা করেন।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পরবর্তীতে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হন এই অভিনেতা। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লিখিত বিবৃতি প্রদান করেন তিনি এবং পরবর্তীতে হাতজোড় করে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জানান, অনুষ্ঠানে বলা কথাগুলো তাঁর ব্যক্তিগত মতামত ছিল না; বরং পুরো অংশটিই ছিল চিত্রনাট্যনির্ভর একটি ব্যঙ্গাত্মক পরিবেশনা।

ঠিক কী বলেছিলেন সঞ্জয়? গান্ধীজয়ন্তীর বিশেষ পর্বে দেশের মানুষ ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সঞ্জয় বলেন, “দেশের মানুষ খুবই ভালো, উদার ও অতিথিপরায়ণ। কিন্তু তাঁর মনে হচ্ছে, দেশে এখন আর আগের সেই শান্তি নেই। তিনি প্রার্থনা করেন, যেন সেই দিনগুলো আবার ফিরে আসে।”

এই মন্তব্যের পর জনমনে প্রশ্ন ওঠে—সঞ্জয় ঠিক কোন সময়ের কথা বলছেন? ‘আগের সেই দিন’ বলতে তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ এই কথাটিকে বর্তমান পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ মনে করছেন অনুষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যঙ্গাত্মক প্রেক্ষাপট থেকে কথাটিকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক ব্যঙ্গবিতর্কের আরেকটি বড় কারণ ছিল ‘মুন্না ভাই’ হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কল্পনা করার বিষয়টি। সেখানে রাজনীতির নানা দিক নিয়ে রসিকতা করেন সঞ্জয়। মহাত্মা গান্ধীর তিন বানরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এখন নাকি চতুর্থ একটি বানরও দরকার—কেউ খারাপ কিছু দেখলে সেটি ঠিক করবে কে?

উল্লেখ্য, ‘মুন্না ভাই’ সিরিজে ‘গান্ধীগিরি’র মাধ্যমে অহিংসা, ভালোবাসা ও মানবিকতার বার্তা দেওয়া হয়েছিল। সঞ্জয় দাবি করেন, এই বিশেষ পর্বটিতেও সেই একই ধরনের হাস্যরস ও ব্যঙ্গের আবহ রাখা হয়েছিল। তবে বিনোদনমূলক এই সেগমেন্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুতই একটি বড় বিতর্কে রূপ নেয়।

এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিজেপির মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদ সদস্য পরিনয় ফুকে সঞ্জয় দত্তের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ভারতে শান্তি না পেলে সঞ্জয়ের পাকিস্তান বা ইয়েরওয়াড়া জেলে চলে যাওয়া উচিত। তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। অর্থাৎ, একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের কথা দ্রুতই বলিউডের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়ে পরিণত হয়।

অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা নানা পাটোলে সঞ্জয় দত্তের মন্তব্যের পক্ষে কথা বলেন। তাঁর মতে, দেশের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তারকারাও উদ্বিগ্ন হতে পারেন। তিনি দাবি করেন, যদি জনপ্রিয় ব্যক্তিরাও নিজেদের নিরাপদ মনে না করেন, তবে সরকারকে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ফলে সঞ্জয়ের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে—এক পক্ষ সমালোচনা করে এবং অন্য পক্ষ একে দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ হিসেবে দেখে।

ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ৪ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিবৃতি দেন সঞ্জয়। সেখানে তিনি জানান, কাউকে, কোনো সম্প্রদায়কে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে আঘাত, অপমান কিংবা অসম্মান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর কথাগুলো ছিল একটি ‘স্ক্রিপ্টেড’ ও হালকা মেজাজের কথোপকথনের অংশ।

পরবর্তীতে ৫ অক্টোবর একটি ভিডিও বার্তায় আরও স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানান অভিনেতা। হাতজোড় করে তিনি বলেন, “অনুষ্ঠানের ওই অংশে তিনি চিত্রনাট্য অনুযায়ী অভিনয় করছিলেন। তাই সেখানে বলা কথাগুলো তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা মতামত হিসেবে দেখা উচিত নয়।”

সঞ্জয়ের দাবি, দর্শকেরা কেন তাঁর কথায় বিস্মিত বা ক্ষুব্ধ হয়েছেন তা তিনি বুঝতে পারছেন। তবে তিনি অনুরোধ করেন, যেন মানুষ তাঁর বক্তব্যগুলো অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটেই বিচার করেন।

এই বিতর্কের মাঝে অভিনেতা সঞ্জয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন সঞ্চালক শেখর সুমন। তাঁর বক্তব্য, সঞ্জয় দত্ত ভারতের মানুষ ও দেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। অনুষ্ঠানটি মূলত ব্যঙ্গ ও রসিকতার মাধ্যমে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তাই সঞ্জয়ের বক্তব্যকে নেতিবাচক বা দেশবিরোধী অর্থে নেওয়া ঠিক নয়। শেখর সুমনের মতে, সঞ্জয়কে তাঁর বলা কথার জন্য এমনভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, যা তিনি বলেনইনি। তাঁর দাবি, অভিনেতার মন্তব্যকে মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়েছে।