এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নম্বর প্রদান কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের প্রায় আট হাজার শিক্ষক শাস্তির সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর বিভিন্ন অসংগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত বছরের এই দুই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে যে গাফিলতি করা হয়েছিল, সেটিও এখন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে এবং আমলে নেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কারও ক্ষেত্রে আগামী দুই বছর পর্যন্ত খাতা দেখার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের জন্য সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনের আওতায় আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ের নম্বর প্রদানকে ‘অনুচিত’ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা নির্দিষ্ট করতে একটি ‘পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এই নতুন নীতিমালায় ওভার মার্কিং (অতিরিক্ত নম্বর) এবং আন্ডার মার্কিংয়ের (কম নম্বর) একটি গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ করা হবে। যদি কোনো পরীক্ষক এই নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নম্বর প্রদান করেন, তবে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, এই বিষয়ে বিভিন্ন বোর্ডে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি বিস্তারিত জানানো হবে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্মতি পাওয়া গেলে নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, “ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিংয়ের বিষয়ে যেসব শিক্ষকের ত্রুটি রয়েছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নীতিমালা কমিটি যাচাই-বাছাই করে কত নম্বরকে অনুচিত নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নির্ধারণ করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক উত্তরপত্রে অসংগতি ধরা পড়ে। গত ১০ আগস্ট ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে পাস করেছেন ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
ফলাফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন গ্রহণ করা হয়। মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেন। যেহেতু অনেক শিক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছিলেন, তাই মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আওতায় আসে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি।
পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল করার পর পাস করেছেন। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯ জন। এছাড়া ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৫৬ হাজার ২৫৯টি উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তিত হয়েছে।
খাতা মূল্যায়নে ভুলের দায়ে পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ হাজার ৬৮৪ জন প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষককে আগামী দুই বছর কোনো পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হবে না।
যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী জানান, নির্ভুল ফলাফল প্রকাশের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খাতা মূল্যায়নে যারা গাফিলতি করেছেন বা ভুল করেছেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হবে।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পুনর্নিরীক্ষণের পর যশোর বোর্ডে ২ হাজার ৪৩৬ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮০ জন ফেল করা শিক্ষার্থী পাস করেছেন এবং ১ হাজার ৩০৪ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়া ৭৫২ জন নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। এই ফলাফলের বিশ্লেষণ করেই খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি বা ভুল করা পরীক্ষকদের শনাক্ত করা হয়েছে।
খাতা মূল্যায়নে যদি ইচ্ছাকৃত অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে অনুমোদিত সংশোধিত আইনে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বা মেধাতালিকায় হ্যাকিং কিংবা অবৈধ পরিবর্তনকে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ হিসেবে নতুন অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ওভার মার্কিং ও আন্ডার মার্কিংয়ের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশোধিত আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুল, অসাবধানতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর বাড়ানো বা কমানোর ঘটনাগুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই কারণেই ‘অনুচিত নম্বর’-এর সীমা নির্ধারণ করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পরীক্ষা পরিচালনায় গাফিলতির অভিযোগে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ৩৪টি কেন্দ্রের সচিবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। গত রোববার জারি করা ওই নোটিশে আগামী ৭ অক্টোবরের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।