বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বহিঃশক্তির প্রভাবে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা সব সময়ই থাকে। তবে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব যদি বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো যথেষ্ট সতর্ক থাকে। কারণ, এই জলসীমায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সমস্যা তৈরি হলে তা বাংলাদেশসহ কোনো দেশের জন্যই ইতিবাচক হবে না। তাই এই অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ রাখা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ রাখা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামষ্টিক স্বার্থ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। আজ সোমবার এই আয়োজনের শেষ দিনে ‘বিশ্বের জন্য বঙ্গোপসাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সমাপনী বক্তব্যের ঠিক আগের পর্বে এই আলোচনাটি সম্পন্ন হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এবং সানোবার ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান আইজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এশিয়ার অন্যান্য সমুদ্র অঞ্চলের মতো বঙ্গোপসাগরের ক্ষেত্রেও ক্রমবিকাশমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, চীনের সমর্থক মহলে একে ‘চীন ঠেকাও নীতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

আইজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। কিন্তু আমরা দেখেছি, চীনারা তাদের কিছু সামুদ্রিক বাণিজ্য এশিয়া ও ইউরোপের দিকে নিয়ে গেছে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ইউরেশিয়ান অংশীদারত্বের ধারণা থেকে সুবিধা নিচ্ছে। অর্থাৎ অনেক চীনা ব্যবসা সামুদ্রিক রুট পরিবর্তন করছে।’

সাবেক এই কূটনীতিক আরও জানান, বাব আল–মানদেব ও হরমুজ প্রণালি বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে। এমতাবস্থায় মালাক্কা প্রণালি যদি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির শিকার হয়, তবে তা উদ্বেগের বিষয় হবে। এই পরিস্থিতি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিম এশিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনো সংঘাতের পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

বঙ্গোপসাগর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান স্পষ্ট করে আইজাজ আহমেদ বলেন, ‘পাকিস্তান বঙ্গোপসাগরীয় সম্প্রদায়ের গুরুত্ব স্বীকার করে। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি, ব্যবসার রুট হওয়া উচিত মুক্ত ও অবাধ। আমাদের পণ্যও ভারত মহাসাগর দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ রাখা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ রাখা এটা আমাদের সামষ্টিক স্বার্থ।’

অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের এশিয়া স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক প্রদীপ তানেজা বলেন, বাইরের শক্তি চাইলে এই অঞ্চলে সমস্যা তৈরি করতে পারে, এই আশঙ্কা সব সময়ই বিদ্যমান। তবে এটি মূলত বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোর সতর্কতার ওপর নির্ভর করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অঞ্চলে কোনো সমস্যা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে সেটি বাংলাদেশসহ কারও জন্য হিতকর হবে না। প্রদীপ তানেজা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ ও নেতারা নিজ দেশের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন বলে আমি মনে করি।’

আলোচনায় ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ডেনমার্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য অংশীদারিত্বের কথা বলেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ তার রপ্তানি খাতকে আরও বহুমুখী করতে পারে। বিশেষ করে ওষুধ খাতের পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণ এবং জাহাজ রিসাইক্লিং বা ভাঙার ব্যবসা একটি সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে।

ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মাথাপিছু হিসেবে ডেনমার্ক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং বিভিন্ন খাতে ডেনমার্কের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। ফলে কিছু উন্নয়ন-সহায়তা কমাতে হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসারিয়াল লেকচারার জন কে গ্লেন আলোচনায় বলেন, ‘পৃথিবীর পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, এর সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু এরপর কী আসছে, সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। শুধু নতুন ব্যবস্থাকে সমর্থন করাই যথেষ্ট নয়।’

এ আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন ঢাকায় নিযুক্ত মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনিন রাশিদ।