পাহাড়ি এলাকার দুর্গম জনপদের কোনো শিশু যেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়া শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন এই দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বান্দরবানের থানচি উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন এবং প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য তিনি ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে অর্থ উপার্জন করেন।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের মধ্যে তাকেও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে সারাদেশ থেকে নির্বাচিত ১০২ জন শিক্ষককে তাদের অনন্য অবদানের জন্য সম্মানিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের সাতজন শিক্ষকের তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন দুর্গম পাহাড়ি এলাকার এই শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।

সম্মাননা পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বামং খিয়াং মিংলেন বলেন, “এই সম্মান শুধু আমার একার নয়। এটি তিন্দুর শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী এবং পুরো পাহাড়ি এলাকার মানুষের সম্মান। আমি চাই, দুর্গম এলাকার কোনো শিশু অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হোক।”

শিক্ষকতার সংজ্ঞা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “শিক্ষকতা শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষককে প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে পাশে দাঁড়াতে হয়।”

বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ তিন্দুতে অবস্থিত তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে এই এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার আর্থিকভাবে অত্যন্ত অসচ্ছল। ফলে অনেক পরিবারের পক্ষে নিয়মিত বিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয় না।

এমন পরিস্থিতিতে একদিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও বিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয় মেটানো ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই আর্থিক সংকটের কারণে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে হাল ছাড়েননি প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং সহকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছুটির দিনগুলোতে তিনি থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালান। পর্যটক এবং স্থানীয় যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটাতে। দিনের বেলা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং ছুটির দিনে নদীতে নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ের খরচ জোগাড় করার এই জীবনচিত্র হয়ে উঠেছে এক অনন্য সংগ্রামের গল্প।

বামং খিয়াং মিংলেনের এই অসাধারণ উদ্যোগের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একজন প্রধান শিক্ষক নিজের সহকর্মীদের বেতন দিতে নৌকা চালাচ্ছেন—এমন ঘটনা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্রশংসিত হয়।

বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়া গেছে এবং বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘোষণাকে তিন্দু এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় আশার আলো হিসেবে দেখছেন। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসংকট দূর হবে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ায় তিন্দুর শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত গর্বিত। তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার সংকট দূর করতে একজন শিক্ষক কতটা দায়িত্বশীল ও আত্মত্যাগী হতে পারেন, তার বাস্তব উদাহরণ হলেন বামং খিয়াং মিংলেন।

নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন বলেন, “বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা যেন বেতনসংকটে না পড়েন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে চিন্তা থেকে নৌকা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিক্ষকতা আমার পেশা, এই বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আমার দায়িত্ব।”

তিনি আরও জানান, দুর্গম এলাকার দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য এই বিদ্যালয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়, তিনি তা চাননি। তাই নিজের শ্রম দিয়ে হলেও বিদ্যালয়টি চালু রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তিনি।