পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি গঠনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সোমবার বিকেল চারটায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’-এর উদ্যোগে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা একযোগে দাবি জানান যে, বর্তমান সরকারের এই কমিটি গঠন প্রক্রিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উল্লেখ্য যে, গত ১০ সেপ্টেম্বর সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট তিনটি কমিটি গঠন করে। এগুলো হলো— ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক জাতীয় কমিটি’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক নির্বাহী কমিটি’ এবং ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক পরামর্শক কমিটি’। এই তিনটির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৯ সদস্যের একটি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক জাতীয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, আন্দোলন হচ্ছে, বড় বড় পরিবর্তনও হচ্ছে; কিন্তু পাহাড়ের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আশা করেছিলাম, এবার পাহাড়ি, আদিবাসী, বাঙালিসহ সবার সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের নিত্যনতুন কৌশল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাই কালবিলম্ব না করে পাহাড়িদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে এবং তিন-চারটি অকার্যকর কমিটির পরিবর্তে একটি কার্যকর কমিটির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি দাবি জানান।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সমাবেশে বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, সরকার যদি মনে করে চুক্তিটি যথাযথ নয়, তবে সেটি বাতিল বা সংশোধনের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে। আর যদি চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করতে চায়, তবে তা সুনির্দিষ্টভাবে করতে হবে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বেসরকারি সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, বিএনপি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এর বিরোধিতা করলেও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকার চুক্তিটি বাতিল করেনি। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন সরকারও চুক্তিটিকে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর মনে করেনি।
শামসুল হুদা আরও বলেন, ‘বর্তমানে গঠিত তিনটি কমিটি শুধু আমলাতান্ত্রিক ও গোয়েন্দা সংস্থানির্ভর। তথ্য সংগ্রহের জন্য এসব কমিটি প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সমস্যা সমাধানে এগুলো সহায়ক নয়; বরং প্রতিবন্ধক। এ কারণেই আমরা আলোচনায় এসব কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছি।’
সমাবেশে কথা বলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান। তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার প্রধান কারণ আমাদের মনস্তত্ত্বে। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী অনেক পুলিশ, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ মনে করেন, পাহাড়কে অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে; তাই চুক্তি বাস্তবায়ন না করার নানা পথ খোঁজা হয়।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে সংহতি জানান বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের নেতা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্রসংগ্রামের নেতাসহ আরও অনেকে।
সমাবেশে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— চুক্তিবিরোধী তিন কমিটি অবিলম্বে বাতিল করা, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন, অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার এবং মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করা। এছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নে সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিধিমালা প্রণয়ন করে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
পাশাপাশি, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ করা এবং ভূমিসহ পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে একটি বহুপক্ষীয় সংলাপ আয়োজনের দাবিও জানানো হয়।