পুরান ঢাকার জনসন রোডের ব্যস্ততা আজকের দিনেও বিদ্যমান, তবে এক সময়ের শহরের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সদরঘাটে তখন নিয়মিত ভিড়ত স্টিমার ও নৌকা। জজকোর্ট, ব্যাংক, সরকারি দপ্তর এবং ইউরোপীয়দের বসতিকে কেন্দ্র করে জনসন রোড হয়ে উঠেছিল শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তবে সেই সময়ে বিদেশি অতিথিদের জন্য আধুনিক মানের হোটেল কিংবা ইউরোপীয় ধাঁচের রেস্তোরাঁ ছিল খুবই সীমিত।

ঠিক এই সময়েই জনসন রোডে আবির্ভাব ঘটে একটি প্রতিষ্ঠানের, যার নাম ছিল ‘ওকে’। ঢাকার খাবারের ইতিহাসের পাতায় এই নামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা শহরের ইতিহাস ও খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন তথ্যের সূত্র ধরে ‘ওকে’-কে ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকের হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। গবেষক সাদ উর রহমানের লেখা ‘ঢাকাই খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতি’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, “‘ওকে’ ছিল ঢাকার প্রথম হোটেল ও রেস্তোরাঁ।” এছাড়া মুক্তকণ্ঠতেও একে ঢাকার প্রথম দিকের রেস্তোরাঁগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ‘ওকে’ ঠিক কোন সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে তথ্যের ভিন্নতা রয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে ১৯৪৩-৪৪ সালের কথা বলা হয়েছে, আবার সাদ উর রহমানের উদ্ধৃতিতে ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠার সাল নিয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জনসন রোডের সেই দোতলা ভবন

জজকোর্টের খুব কাছেই জনসন রোডে অবস্থিত ছিল ‘ওকে’। বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও ঐতিহাসিক তথ্যে জায়গাটিকে মুকুল সিনেমা বা মুকুল থিয়েটারের পাশের এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রকাশিত একটি পুরোনো ছবির ক্যাপশনেও ‘ওকে’ রেস্তোরাঁর পাশে মুকুল থিয়েটারের কথা বলা হয়েছে।

ভবনটি ছিল দোতলা। নিচের তলায় ছিল রেস্তোরাঁ এবং ওপরের তলায় অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা। অর্থাৎ এটি কেবল খাবারের জায়গা ছিল না, বরং বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি ছিল একটি গেস্ট হাউসের মতো। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা আসা ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় অতিথিরা সাধারণত সরকারি বাংলো বা অতিথিশালায় থাকতেন। বেসরকারি হোটেলের সুযোগ খুব কম থাকায় বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং প্রশাসনিক কাজে আসা ইউরোপীয়দের জন্য ‘ওকে’ হয়ে উঠেছিল একটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।

ঢাকার টেবিলে ব্রেড, বাটার ও ওমলেটের আগমন

‘ওকে’-র সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর পরিবেশ ও খাবারের ধরন। তৎকালীন ঢাকার সাধারণ দোকানে যে খাবার পাওয়া যেত, ‘ওকে’ ছিল তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে পরিবেশন করা হতো ব্রেড, বাটার, ওমলেট, প্যাটিস, হ্যাম, চিকেন ফ্রাই, রোল ও চপের মতো খাবার। এমনকি কাঁটা-চামচ ব্যবহারের ব্যবস্থাও ছিল সেখানে।

খাবারের পাশাপাশি পরিবেশটিও ছিল পুরোপুরি ইউরোপীয় ধাঁচের। মেনু কার্ড, টেবিলের আনুষ্ঠানিক সাজসজ্জা এবং অতিথি আপ্যায়নের বিশেষ রীতি ছিল সেখানে। ফলে তৎকালীন ঢাকার মানুষের কাছে এটি ছিল এক নতুন শহুরে অভিজ্ঞতা। অনেকের কাছে রেস্তোরাঁয় বসে এমন খাবার খাওয়া ছিল চরম কৌতূহলের বিষয়, আবার ইউরোপীয়দের জন্য এটি ছিল স্বচেনা স্বাদের খাবার ও আশ্রয়ের জায়গা।

কেরোসিনচালিত ফ্রিজ ও আধুনিকতা

বর্তমান সময়ে ফ্রিজ ছাড়া রেস্তোরাঁ কল্পনা করা অসম্ভব, কিন্তু সেই সময়ে ঢাকায় আধুনিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ছিল বিরল। স্মৃতিচারণে জানা যায়, ‘ওকে’-তে কেরোসিনচালিত ফ্রিজ ছিল। এছাড়া বিদ্যুতের পাখা ও বাতির ব্যবস্থাও ছিল, যা তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত আধুনিক হিসেবে বিবেচিত হতো।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ওকে’-তে মদ্যপানের ব্যবস্থাও ছিল, যা ইউরোপীয় অতিথিদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তবে এই বিবরণগুলোর বড় অংশ স্মৃতিচারণ ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, সমকালীন ব্যবসায়িক নথি দিয়ে প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সকালের নাশতায় ভিড়

সকালের নাশতার জন্য ‘ওকে’ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, সকালে সেখানে প্রচুর ভিড় জমত। অনেকে ঘোড়ার গাড়ি বা মোটরকার থামিয়ে দ্রুত নাশতা করে কাজে বেরিয়ে যেতেন। গরম পাউরুটি ও মাখন ছিল তাদের প্রধান আকর্ষণ। স্থানীয়দের জন্য ভেতরে বসে খাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকলেও পাউরুটি ও মাখন কিনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। আজকের দিনের অসংখ্য নাশতার দোকানের ভিড়ের অনেক আগে থেকেই গরম পাউরুটি ও মাখনের এই আকর্ষণ শুরু হয়েছিল।

সময়ের পরিবর্তন ও মালিকানা বদল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ঢাকার চেহারাও বদলে যায়। সাদ উর রহমানের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ‘ওকে’-র প্রাথমিক মালিক ছিলেন একজন স্কটিশ ব্যক্তি। তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ইউরোপীয়দের জন্য উপযোগী হোটেল ও রেস্তোরাঁর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এটি শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে যুদ্ধ ও দেশভাগের সময় তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেয় একটি নতুন পরিবার।

‘ওকে’ থেকে ‘মাইরেন্ডার’

দেশভাগের কাছাকাছি সময়ে রবার্ট জোন্স ও তার কন্যা ডলি জোন্স ঢাকায় আসেন। মওলা বখশ সরদারের পরিবারের সাথে তাদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল। তারা ‘ওকে’ হোটেল-রেস্তোরাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘মাইরেন্ডার’।

দেশভাগের পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ায় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তা ঢাকায় আসতে শুরু করেন। এই পরিবর্তনের সাথে সাথে মাইরেন্ডারও নতুন পরিচয় পায় এবং স্থানীয় অভিজাত শ্রেণির মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখানে কাটলেট, ক্র্যাম্প চপ ও রোলের পাশাপাশি দুপুরে একটি হলুদ রঙের স্যুপ পরিবেশন করা হতো, যা স্থানীয়ভাবে ‘মুন্নি কি তান্নি’ নামে পরিচিত ছিল।

ডলি জোন্সের অনন্য ভূমিকা

মাইরেন্ডারের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় নাম ডলি জোন্স। রবার্ট জোন্সের মৃত্যুর পর ডলি নিজেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন। আজিম বখশের স্মৃতিচারণে জানা যায়, খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক সব বিষয়েই তিনি সক্রিয় ছিলেন।

ডলি কেবল মালিকের মেয়ে হিসেবে নন, বরং একজন দক্ষ পরিচালক হিসেবে মাইরেন্ডারের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ডলিকে মাইরেন্ডারের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই সময়ে একজন নারী মালিকের প্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে কাজ করা এবং ব্যবসা পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও সাহসী পদক্ষেপ।

মাইরেন্ডারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ

ষাটের দশকের শেষ দিকে মাইরেন্ডারের যে রূপ স্মৃতিতে অমলিন, সেখানে সদর দরজায় ছিল হাফ সুইং ডোর। ভেতরটা ছিল একটি বড় হলঘরের মতো, যেখানে ১০ থেকে ১২টি গোল টেবিল এবং প্রতিটি টেবিলে তিন-চারটি চেয়ার ছিল। টেবিলে বিছানো থাকত টেবিলক্লথ।

ভারী সিরামিকের থালাবাসনে পরিবেশন করা হতো বড় কাপের চা। পেছনের দিকে ছিল ক্যাশ কাউন্টার, তারপর রান্নাঘর এবং সবশেষে গাড়ি রাখার গ্যারেজ। গ্যারেজের পাশেই ছিল একটি পুকুর। ডলি জোন্সদের একটি শেভ্রলে গাড়িও ছিল। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মাইরেন্ডার কেবল একটি রেস্তোরাঁ ছিল না, বরং পুরান ঢাকার সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

স্মৃতিতে অম্লান ‘ক্র্যাম্প চপ’

মাইরেন্ডারের মেনুতে ‘ক্র্যাম্প চপ’ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই খাবারের সাথে জড়িয়ে আছে বাবুর্চি জোসেফ গোমেজের নাম। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাইরেন্ডার বন্ধ হওয়ার পর তিনি বাংলাবাজারের ক্যাফে কর্নারে কাজ শুরু করেন এবং সেখানে ক্র্যাম্প চপ তৈরির ঐতিহ্য বজায় রাখেন। পরবর্তীতে তার শিষ্য জন গোমেজও এই খাবারে দক্ষতা অর্জন করেন। রেস্তোরাঁ হারিয়ে গেলেও খাবারের স্বাদ মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, আর ক্র্যাম্প চপ হয়ে উঠেছিল সেই ঐতিহ্যের বাহক।

স্বাধীনতার পর আলেকজান্ডার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডলি জোন্স পুনরায় জনসন রোডে ফিরে আসেন। নতুন দেশের নতুন বাস্তবতায় তাকে সবকিছু শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। আসবাবপত্র কেনা, থালাবাসন সংগ্রহ এবং ভবনের সংস্কারের কথা স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এবার রেস্তোরাঁটির নাম দেওয়া হয় ‘আলেকজান্ডার’। তবে মাইরেন্ডারের মতো জনপ্রিয়তা আর ফিরে আসেনি। সময় ও মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে গিয়েছিল। আজিম বখশের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ডলি ১৯৭৪ সালের দিকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান।

একটি ভবন, তিনটি নাম ও শহরের স্মৃতি

ডলি চলে যাওয়ার পর শাহ কামাল নামে একজন বাঙালি সেখানে একটি হোটেল চালু করেন, তবে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একসময় যে দোতলা ভবনে ব্রেড, বাটার, ওমলেট আর ক্র্যাম্প চপের সুবাস ভেসে বেড়াত, সেই জায়গাটি এখন আইনজীবীদের চেম্বার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে পুরান ঢাকার স্মৃতি থেকে এই জায়গাটি মুছে যায়নি। কেউ মনে রেখেছেন গরম পাউরুটি ও মাখনের কথা, কেউ মনে রেখেছেন বড় কাপের চা কিংবা পাগড়ি ও আচকান পরা পরিবেশকদের। আর অনেকের মনেই গেঁথে আছে ডলি জোন্সের কথা।

ঢাকার রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির এক অধ্যায়

‘ওকে’-কে চূড়ান্তভাবে ঢাকার প্রথম রেস্তোরাঁ হিসেবে প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত প্রাথমিক নথি না থাকলেও, বিভিন্ন গবেষণা ও স্মৃতিচারণে একে ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকের ইউরোপীয় ধাঁচের হোটেল-রেস্তোরাঁ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনেও একে প্রথম দিকের রেস্তোরাঁগুলোর একটি বলা হয়েছে।

‘ওকে’ কেবল একটি রেস্তোরাঁর গল্প নয়, বরং এটি সেই সময়ের ঢাকার প্রতিচ্ছবি যখন জনসন রোড ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র এবং ব্রেড-বাটার ছিল আধুনিকতার প্রতীক। আজ ‘ওকে’, ‘মাইরেন্ডার’ বা ‘আলেকজান্ডার’ নেই, কিন্তু পুরান ঢাকার গলিতে হাঁটলে তাদের গল্প যেন এখনো শোনা যায়। শহরের ইতিহাস কেবল ইট-পাথরে নয়, বরং এক কাপ চা বা একটি ক্র্যাম্প চপের স্বাদেও লেখা থাকে।