শিশু অধিকার রক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার ২০২৬-এর চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার তরুণ সংগঠক ইবনে ইউসুফ আল সাফিন। শিশুদের কল্যাণে কর্মরত তরুণদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই সম্মাননাটিকে গণমাধ্যমে ‘শিশুদের নোবেল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংগঠন কিডসরাইটসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, শিশুশ্রম প্রতিরোধসহ শিশু অধিকার রক্ষায় সাফিনের বহুমুখী কার্যক্রম বিবেচনা করে তাকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালের মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করেছে কিডসরাইটস, যেখানে চুয়াডাঙ্গার এই কিশোর সংগঠকের নাম স্থান পেয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলার সাবেক স্বেচ্ছাসেবক সাইফুল্লাহ আল সাদিক সৌরভ সাফিনের মনোনয়ন আবেদন জমা দিয়েছিলেন। আবেদনের সঙ্গে শিশু অধিকারবিষয়ক সাফিনের বিভিন্ন কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য ও প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র কিডসরাইটসের কাছে প্রেরণ করা হয়।

ইবনে ইউসুফ আল সাফিন চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার সিএন্ডবি পাড়ার বাসিন্দা। তার বাবা মো. শামসুদ্দিন একজন অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এবং মা মোছা. কামরুন নাহার একজন গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে সাফিন মেজো। তিনি চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া জুবিলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে শিশু অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন সাফিন। চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে শিশুশ্রম প্রতিরোধে তার উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সচেতনতামূলক প্রচার, কাউন্সেলিং এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ। বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরা যাতে মাঝপথে বিদ্যালয় থেকে ঝরে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে তিনি শিশু ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সেশন ও আলোচনা সভা পরিচালনা করেন।

শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা সভার আয়োজন করেন সাফিন। এছাড়া শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে যুক্ত রয়েছেন তিনি।

বর্তমানে সাফিন জাতীয় শিশু টাস্কফোর্সের (এনসিটিএফ) চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ‘ডিবেট ক্লাব অব চুয়াডাঙ্গা’-র সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ’-এর চুয়াডাঙ্গা জেলা বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ এবং ‘বাংলাদেশ জাতিসংঘ যুব ও শিক্ষার্থী সমিতি’ (ইউনসা-বাংলাদেশ)-এর সহযোগী সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন এই কিশোর।

সাফিনের এই সাফল্যে গর্বিত তার বাবা মো. শামসুদ্দিন। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক একটি পুরস্কারে বাংলাদেশের ছোট একটি জেলার ছেলে মনোনীত হতে পেরেছে, এটাই আমাদের জন্য অনেক আনন্দ ও গর্বের বিষয়। পুরস্কার পাবে কি না, সেটি বড় কথা নয়। বিশ্বের মঞ্চে নিজের নাম তুলে ধরতে পেরেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি চাই, সে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করুক এবং পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষের ও দেশের জন্য আরও বেশি কাজ করে দেশের জন্য কিছু দিয়ে যাক।”

সাফিনের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও। ভিক্টোরিয়া জুবিলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জেসমিন আরা খাতুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাফিন আমাদের বিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান একজন শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি সে যেভাবে সমাজ ও শিশুদের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের তালিকায় তার নাম আসা আমাদের পুরো বিদ্যালয় তথা চুয়াডাঙ্গা জেলার জন্য এক অভাবনীয় গৌরব। আমরা তার এই মহৎ উদ্যোগের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।”

আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকায় জায়গা পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে ইবনে ইউসুফ আল সাফিন বলেন, “এই অর্জন শুধু আমার একার নয়, এটি চুয়াডাঙ্গার সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কণ্ঠস্বরের স্বীকৃতি। আমাদের সমাজে এখনও অনেক শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শ্রমে বাধ্য হচ্ছে। এই মনোনয়ন আমাকে শিশুদের নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার লড়াইয়ে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে। আমি আজীবন শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে যেতে চাই।”

নিজের কাজের শুরুর কথা স্মরণ করে সাফিন বলেন, “আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হই। পরে জাতীয় শিশু টাস্কফোর্সের (এনসিটিএফ) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে শিশু অধিকার, শিশু সুরক্ষা ও শিক্ষার অধিকার নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাই। ধীরে ধীরে স্কুল ও হাসপাতাল মনিটরিং, শিশুদের নিয়ে সেমিনার, সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংগঠনে দায়িত্ব পাওয়াও আমার জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়।”

আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের মনোনীতদের তালিকায় থাকতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করে সাফিন আরও বলেন, “পুরস্কারটি পাব কি না, সেটি আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুদের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছি এবং সেই কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। পুরস্কার পেলে ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাব। তবে পুরস্কার না পেলেও শিশুদের জন্য কাজ করে যেতে চাই।”

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার’ পান নড়াইলের সাদাত রহমান। ‘সাইবার বুলিং’ থেকে শিশুদের রক্ষায় কাজ করার জন্য তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৫ সালে ইতালির রোমে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের এক সম্মেলন থেকে এই পুরস্কারের সূচনা হয়। প্রতিবছর একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এই পুরস্কারটি হস্তান্তর করেন, যার কারণে একে ‘শিশুদের নোবেল’ বলা হয়।