অধিনায়ক হিসেবে ইমরান খান কেন অন্য সবার চেয়ে আলাদা ছিলেন? এই প্রশ্নের সবচেয়ে সঠিক উত্তর দিতে পারবেন তাঁরই সতীর্থরা। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন আকিব জাভেদ, যিনি ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলের সদস্য ছিলেন এবং ইমরানের অধিনায়কত্বের অধীনে খেলেছেন। ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় মুক্তকণ্ঠের প্রধান ক্রীড়া সম্পাদক উৎপল শুভ্রকে দেওয়া আকিবের এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে সেই অনন্য নেতৃত্বের কথা। ইমরানের জন্মদিনে সেই স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি পুনরায় সামনে আনা হলো।

সাক্ষাৎকারটি হয়েছিল মেলবোর্নের ল্যাংহাম হোটেলের ব্রেকফাস্ট টেবিলে। সেই সময়ে আকিব জাভেদের পরিচয় ছিল ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত দলের কোচ। তবে তাঁর আসল পরিচয় ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলের সেই বিধ্বংসী পেসার। সেই বিশ্বকাপ এবং ইমরান খানকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এই আলাপচারিতা। আকিব জাভেদ যেভাবে আবেগপ্লুত হয়ে ইমরান খানের কথা বলছিলেন, তা সাধারণ প্রশ্নোত্তর আকারে না লিখে তাঁর জবানিতেই তুলে ধরা হয়েছে।

আকিব জাভেদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৯২ বিশ্বকাপের কথা মনে পড়লেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে কেবল একটি মুখ—ইমরান খান। তিনি বিশ্বাস করেন, ওই মানুষটির কারণেই পাকিস্তান বিশ্বকাপ জয় করতে পেরেছিল। ইমরান খানকে নিয়ে সবাই সাধারণত নেতা বা অনুপ্রেরণাদায়ী শব্দগুলো ব্যবহার করেন, তবে আকিব একে আরও সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ইমরান খানের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—সততা, সাহস এবং কঠোর পরিশ্রম। আকিব বলেন, “ইমরান খানের তিনটি জিনিস ছিল—১. তিনি ছিলেন সৎ, ২. সাহসী, ৩. কঠোর পরিশ্রমী। এই তিনেই ইমরান খান। বড় নেতা হতে গেলে এই তিনটি জিনিস আপনার থাকতেই হবে। আপনার সততা থাকলে লোকে আপনাকে সম্মান করবেই, আপনার কথা শুনবে। সাহসী হওয়া মানে আপনি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর পরিশ্রম, এখনো দেখেন না, ইমরান কী অক্লান্ত পরিশ্রমটাই না করে যাচ্ছেন!”

১৯৯২ বিশ্বকাপের এক নাটকীয় মুহূর্তের কথা মনে করে আকিব বলেন, দলের সবাই যখন হতাশ, তখন ইমরানের অদম্য বিশ্বাস সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। আকিব বলেন, “শুরুতেই যখন বললেন, আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমরা এই বিশ্বকাপ জিততে পারি, আমরা সবাই স্তম্ভিত, লোকটা পাগল নাকি!”

সেই বিশ্বকাপের স্মৃতি রোমন্থন করে আকিব জানান, ইমরান ছাড়া অন্য কোনো খেলোয়াড় তখন জয়ের আশা করেননি। পার্থে অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান ম্যাচের আগের কথা মনে করে তিনি বলেন, “আমার এখনো চোখে ভাসে, পার্থে অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান ম্যাচের আগে ইমরান ড্রেসিংরুমে ঢুকছেন। আমরা সবাই তখন বিধ্বস্ত। অথচ ইমরান ভোজবাজির মতো আধা ঘণ্টার মধ্যেই সবাইকে বদলে দিলেন। সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করল, আজ আমরাই জিতব।”

ইমরানের সেই অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতার কথা আকিবের কানে এখনও বাজে। তিনি বলেন, “শুরুতেই যখন বললেন, আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমরা এই বিশ্বকাপ জিততে পারি, আমরা সবাই স্তম্ভিত, লোকটা পাগল নাকি! বক্তৃতাটা এখনো আমার কানে বাজে—অস্ট্রেলিয়ানদের চাপে ফেলার একটাই উপায়, আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়া। যদি রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে নামি, ওরা আমাদের গুঁড়িয়ে দেবে। মাঠে নেমে সবাই ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। দুই স্লিপ, এক গালি থাকবে; বাউন্সার, আউট সুইঙ্গার যার যা আছে সব দেখিয়ে দাও...আমার শুধু উইকেট চাই, রান-টানের কথা ভাবার দরকার নেই। বিশ্বকাপ জিতব, তোমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না তো! একটু ভেবে দেখো, এই ম্যাচটা জিতলে এর পর শ্রীলঙ্কা, ওটা তো আমরা জিতবই। এরপর খেলা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, ওদের আমরা সব সময় বলে-কয়েই হারাই। এরপর সেমিফাইনাল-ফাইনাল।”

আকিব জানান, ওই বক্তৃতার পর তারা এতটাই উদ্দীপ্ত হয়ে মাঠে নেমেছিলেন যে, ব্যাটসম্যান কে তা নিয়ে তারা চিন্তিত ছিলেন না। তিনি বলেন, “ওই বক্তৃতায় সবাই টগবগ করতে করতে মাঠে নামলাম। আমি নিজে আগে-পরে কোনো দিন এমন উদ্দীপ্ত বোধ করিনি। মাঠে নামার সময় মনে হচ্ছিল, কে ব্যাটসম্যান তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। আজ আমাকে কেউ খেলতে পারবে না।”

সেই বিশ্বকাপে আকিব নতুন বলে টানা দশ ওভার বল করতেন। দলের প্রধান বোলিং আক্রমণ ছিল আকিব, ওয়াসিম আকরাম এবং মুশতাক আহমেদ। আকিব অবাক হয়ে বলেন, ইমরান কাঁধের গুরুতর চোট থাকা সত্ত্বেও যেভাবে বোলিং করেছেন তা অবিশ্বাস্য। ইমরান তখন রান আটকে রাখার ভূমিকা নিলেও তাঁর দাবি ছিল কেবল উইকেট নেওয়া।

ইমরানের নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। তিনি কেবল উৎসাহই দিতেন না, বরং প্রতিটি বোলারের কাজ বুঝিয়ে দিতেন। আকিব বলেন, “এমন না যে, ‘নামো জওয়ান, উড়িয়ে দাও’ বলেই দায়িত্ব শেষ করতেন। প্রত্যেককে সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিতেন, কী করতে হবে। আমাকে যেমন বলতেন, তোমাকে দুটি স্লিপ দিচ্ছি, একটা গালি, এবার তোমার আউট সুইঙ্গার দেখাও। মাঝেমধ্যে একটা বাউন্সার ছাড়ো। ওয়াসিমকে আমার সামনেই ডেকে বলেছিলেন, নো-ওয়াইড নিয়ে ভাবার দরকার নেই, তোমার কাজ জোরে বল করা। ওদের কাঁপিয়ে দাও। ওয়াকার তো বিশ্বকাপের আগে আগে ছিটকে পড়ল। এর আগে যখন আমরা তিনজন একসঙ্গে খেলেছি, ওয়াকারের প্রতি তাঁর একটাই নির্দেশ থাকত, সোজা স্টাম্পে বল করো।”

ইমরানের সঙ্গে আকিবের প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি ১৯৮৮ সালের। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ক্যাম্পে নেটে বোলিং করার সময় মুদাসসর নজর এবং ইমরান খান তাঁর বোলিং দেখে আগ্রহী হন। আকিব বলেন, “ইমরানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের দিনটাও পরিষ্কার মনে আছে। ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে আমি আন্ডার নাইনটিন টিমের অনুশীলনে নেটে বল করছি। সেবারই প্রথম হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ক্যাম্প। মুদাসসর নজর ও ইমরান আমার বোলিং দেখে আমার কী নাম, কোথায় বাড়ি এসব জানতে চাইলেন। ইমরান হঠাৎ আমাকে বললেন, ওরা যদি তোমাকে দলে না নেয়, তুমি এসে ন্যাশনাল টিমের নেটে বোলিং করবে।”

পরবর্তীতে ইমরান তাঁর কথা রেখে আকিবকে ভারতে একটি চ্যারিটি ম্যাচে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কারের বিপক্ষে বোলিং করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আকিব বলেন, “ইমরানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের দিনটাও পরিষ্কার মনে আছে। ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে আমি আন্ডার নাইনটিন টিমের অনুশীলনে নেটে বল করছি। সেবারই প্রথম হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ক্যাম্প। মুদাসসর নজর ও ইমরান আমার বোলিং দেখে আমার কী নাম, কোথায় বাড়ি এসব জানতে চাইলেন। ইমরান হঠাৎ আমাকে বললেন, ওরা যদি তোমাকে দলে না নেয়, তুমি এসে ন্যাশনাল টিমের নেটে বোলিং করবে।” (দ্রষ্টব্য: মূল টেক্সটে এই অংশটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে)।

ভারতে সেই ম্যাচে ইমরান ফিল্ড সাজিয়ে আকিবের মতামত জানতে চান। আকিব তখন গাভাস্কারের সামনে দাঁড়িয়ে সাহসের সাথে বলেন যে, তিনি স্কয়ার লেগের ফিল্ডারকে দ্বিতীয় স্লিপে চান কারণ তাঁর বল বেরিয়ে যায়। ইমরান হেসে তা মেনে নেন এবং আকিব সেই ম্যাচে দুটি উইকেট পান। এরপর ইমরানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি আকিবকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যান, যেখান থেকে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয়।

ক্রিকেটের বাইরেও ইমরানের ব্যক্তিত্ব আকিবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি মনে করেন, ইমরানের চিন্তা ও ভিশন অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আকিব বলেন, “তাঁর (ইমরান খান) সঙ্গে যখনই কথা হয়েছে, দেখেছি সাধারণ কোনো কিছুতে তাঁর আগ্রহ নেই। সব সময়ই বড় চিন্তা।”

খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর ইমরান সাধারণ জীবন কাটাতে পারতেন, কিন্তু তিনি ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি করেছেন এবং এখন পাকিস্তানকে বদলে দেওয়ার লড়াই করছেন। আকিবের মতে, কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাই ইমরানের স্বভাব। তিনি বলেন, “দেখুন না, খেলা ছাড়ার পর দিব্যি কমেন্ট্রি-টমেন্ট্রি করে আরামে দিন কাটাতে পারতেন। প্রথমে ক্যানসার হাসপাতাল করলেন। এখন নেমেছেন পাকিস্তানকে বদলে দেওয়ার কাজে। এমনই হওয়ার কথা, কারণ কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাই ইমরানের পছন্দ। তাঁর সঙ্গে যখনই কথা হয়েছে, দেখেছি সাধারণ কোনো কিছুতে তাঁর আগ্রহ নেই। সব সময়ই বড় চিন্তা।”

পরিশেষে আকিব জাভেদ বলেন, ইমরান সৎ এবং তাঁর কোনো বৈষয়িক লোভ নেই। তিনি কেবল দেশের জন্য কাজ করছেন। আকিবের ভাষায়, “ইমরান লিডার, এটা সবাই জানেন। তা লিডার তো অনেকেই। ইমরান খানের ক্ষেত্রে আমি বলব, ইমরানকে লিডার লেখার সময় ‘এল’ অক্ষরটা বড় হাতে লিখুন।”