প্রতিদিন ভোরে মাদ্রাসায় উপস্থিত হন তারা। নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সব দায়িত্ব পালন করেন তারা। তবে মাস শেষে যখন অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা বেতন পান, তখন তাদের হাতে আসে শূন্যতা। এই করুণ পরিস্থিতি এক-দুই বছর নয়, বরং দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে চলে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ে একজন শিক্ষক বেতন পাওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্য একজন শিক্ষক দীর্ঘ ১৪ বছর শিক্ষকতা করার পর অবসরে গেছেন, কিন্তু তার ভাগ্যে এক মাসের বেতনটুকুও জোটেনি।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের শিংরোড রতনীবাড়ী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মচারীদের জীবন এখন এমনই বেতনহীন এক দীর্ঘ অপেক্ষায় আটকে আছে।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নতুন করে শুরু হয়। ২০০২ সালে এটি প্রাথমিক পাঠদানের অনুমতি পায় এবং ২০০৪ সাল থেকে এখানে দাখিল পরীক্ষা শুরু হয়। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি একাডেমিক স্বীকৃতি পেলেও এত বছর পার হয়ে গেলেও এমপিওভুক্ত হয়নি। বর্তমানে এখানে ১১ জন শিক্ষক এবং ৩ জন কর্মচারী কর্মরত আছেন। কাগজে-কলমে এই মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৮০ জন।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমপিও না হওয়ায় ইতোমধ্যে তিনজন শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গিয়ে চাকরি করছেন। একজন শিক্ষক চাকরিরত অবস্থায় ২০১৯ সালে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব পালন করলেও জীবদ্দশায় কোনো বেতন পাননি।
আরেক শিক্ষক মজিবুর রহমান ২০০১ সালে ক্বারি শিক্ষক হিসেবে এই মাদ্রাসায় যোগ দেন এবং ২০১৫ সালে অবসরে যান। দীর্ঘ ১৪ বছর দায়িত্ব পালন করেও তিনি কোনো বেতন পাননি। এই বিষয়ে মজিবুর রহমান বলেন, “আমি ২০০১ সালে যোগদান করি। ২০০২ সালে নিয়োগপত্র পাই। ২০১৫ সালে অবসরে যাই। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো বেতন পাইনি। বিনা বেতনে অবসর নিয়েছি। কষ্ট তো অবশ্যই হয়েছে। নিজের সংসারেও অনেক ক্ষতি হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এখানে ছিলাম।” তবে বেতন না পেলেও নিজের হাতে গড়া শিক্ষার্থীদের সাফল্যই তার জীবনের বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার পড়ানো অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।
মাদ্রাসার সিনিয়র মৌলভী শিক্ষক কামাল হোসেন গত ২৬ বছর ধরে এখানে শিক্ষকতা করছেন। দীর্ঘ সময় বেতন না পাওয়ায় সংসার চালাতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত চরম সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কামাল হোসেন বলেন, “আমরা ২৬ বছর ধরে খুব কষ্টের দিন যাপন করছি। আমাদের চলাফেরা, বাচ্চাকাচ্চার লেখাপড়া এবং সংসারের খরচ চালানো খুবই দূরূহ হয়ে গেছে। আমরা পারছি না। অন্য কোনো কর্মসংস্থান বা ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অনুরোধ, শিংরোড রতনীবাড়ী ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসাটি যেন খুব শিগগির এমপিওভুক্ত করা হয়।”
মাদ্রাসার অফিস সহকারী আনসারুল ইসলাম জানান, ২০০০ সাল থেকে তারা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ২০০৪ সালে প্রথম দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকে নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মাদ্রাসাটি। দীর্ঘ সময় চাকরি করেও তারা বেতনভুক্ত হতে পারেননি। আনসারুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পরও আমরা বেতনভুক্ত হতে পারিনি। আমাদের একজন শিক্ষক বিনা বেতনে অবসর নিয়েছেন, একজন শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করে মারা গেছেন। তিনজন শিক্ষক অন্যত্র চলে গেছেন। আমরা অনেক মানবেতর জীবনযাপন করছি। দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও কোনো বেতনভুক্ত হতে পারিনি। আমরা সন্তানদের কাছেও লজ্জিত।”
তিনি আরও বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করে আসছেন। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিবারে স্বস্তি ফিরবে বলে তিনি আশা করেন।
২০০২ সাল থেকে এই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন শহিদুল ইসলাম। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। বেতন না থাকায় সন্তানদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছেন না তিনি। শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা খুব কষ্টে এই প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে আসছি। আমাদের বেতন নেই। ছেলে-মেয়েদের ঠিকমতো তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। পারিবারিক অবস্থা বর্তমানে খুবই কঠিন।”
মাদ্রাসার ইবতেদায়ি প্রধান রৌশনারাও ২০০২ সাল থেকে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। তার ছেলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে সংসারে অভাব-অনটন আরও বেড়েছে। রৌশনারা বলেন, “আমার ছেলেমেয়েগুলো বড় কিছু করুক এটা আমাদের ইচ্ছা। কিন্তু অভাব-অনটনের কারণে অনেক কিছু করতে পারছি না। বেতনভুক্ত না হওয়ার কারণে আমরা কিছুই করতে পারছি না।”
দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থকষ্টে থাকলেও মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থীদের ফলাফল খুব একটা খারাপ নয়। ২০২৪ সালে ৯ জন দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৭ জন পাস করে। ২০২৫ সালে ১২ জনের মধ্যে ৯ জন এবং ২০২৬ সালে ১৪ জনের মধ্যে ৯ জন পাস করে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে স্থানীয় মজির উদ্দীন সর্দার মাদ্রাসার জন্য ১ একর ৬৬ শতক জমি দান করেন। সেই জমিতেই প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে মাদ্রাসার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও ২০০০ সালে পুনরায় তা শুরু হয়। বর্তমানে কর্মরত ১১ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারীর প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এবার এমপিওভুক্ত হবে।
মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার হাসিবুল ইসলাম বলেন, “২০০০ সাল থেকে শিংরোড রতনীবাড়ী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০২ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। ২০০৪ সালে প্রথম দাখিল পরীক্ষা শুরু হয়। আজ পর্যন্ত আমাদের পরীক্ষা ভালো হয়েছে। তিনজন শিক্ষক অন্যত্র চলে গেছেন, একজন শিক্ষক মারা গেছেন, একজন শিক্ষক বিনা বেতনে অবসর নিয়েছেন। আমরা খুব কষ্টেই দিনযাপন করছি।”