দেশ ও জাতি গঠনে শিক্ষকই হলেন সেই মূল কারিগর, যিনি মানুষকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবশক্তিতে রূপান্তরিত করেন। একজন শিক্ষার্থীর নৈতিকতা, রুচিবোধ, শিষ্টাচার এবং জ্ঞান অর্জনের পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। আদর্শ শিক্ষকের সান্নিধ্যে শিক্ষার্থীর চিন্তা ও মানসিকতার সঠিক বিকাশ ঘটে, যার ফলে সে বিনয়ী, কল্যাণমুখী, সৃষ্টিশীল এবং একজন উন্নত হৃদয়ের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় সৃষ্টির শুরু থেকেই শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনেস্কো বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে তৎকালীন মহাপরিচালক ফ্রেডারিক এম মেয়র ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
এই বিশেষ দিবসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। বিশ্বজুড়ে আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি বিভিন্ন আলোচনা, সংলাপ ও সমালোচনামূলক সভার মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাগত সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল্যায়ন করা হয়। একইসাথে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয় এই দিনে।
শিক্ষকতা কেবল একটি সাধারণ চাকরি নয়; বরং এটি একটি মহান পেশা এবং জীবনব্যাপী ব্রত। যুগে যুগে আদর্শ শিক্ষকরা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডার বিলিয়ে দিয়েছেন। বিনিময়ে তাঁরা কী পেলেন, সেই প্রশ্ন না করে কেবল শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মহৎ চেতনায় তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়ী, পরিশ্রমী, অনুসন্ধানী ও জ্ঞানপিপাসু হিসেবে গড়ে তোলাই একজন শিক্ষকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
একজন আদর্শবান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এমন সততা ও নিষ্ঠার সাথে পাঠদান করবেন, যাতে শিক্ষার্থীর আলাদা করে গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের প্রয়োজন না হয়। শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচরণও হতে হবে তাঁর বক্তব্যের সাথে সংগতিপূর্ণ। তবে শিক্ষকদের কাছ থেকে দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা করলেই চলবে না, এর জন্য প্রয়োজন একটি সহায়ক পরিবেশ ও শিক্ষার অনুকূল পরিস্থিতি। সেই সাথে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার ও যথাযথ মর্যাদা।
শিক্ষাঙ্গন থেকে দলাদলি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দূর করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি প্রথা বিলুপ্ত করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা না করে, যথাযথ জরিপের মাধ্যমে কেবল চাহিদার ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দেওয়া উচিত।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেলেও আমাদের দেশে এখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের অসংগতিপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান, যা গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার পথে অন্যতম অন্তরায়। একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী শিক্ষানীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় এক ধরনের দিকনির্দেশনাহীন ও সমন্বয়হীন শিক্ষাকার্যক্রম বর্তমানে চলছে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর প্রয়োজন মেটাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কোনো ক্ষেত্রেই তারা সেই অনুপাতে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মতো বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা, নিয়োগনীতি ও অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার সুযোগ পান না। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষা সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দরভাবে জীবনযাপনের জন্য অভিন্ন বেতন-ভাতা, চাকরির নিশ্চয়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। তাই শিক্ষকতা পেশাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করতে হবে।
এই লক্ষ্য অর্জনে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত জাতীয়করণ সম্ভব হচ্ছে না, ততক্ষণ বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে আধা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ঘোষণা করা যেতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রারম্ভিক বেতনের ১০০ শতাংশ এবং অন্যান্য ভাতার আংশিক অংশ পান। তাঁদের জন্য সরকারি শিক্ষকদের মতো বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট), বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও পূর্ণাঙ্গ পেনশন চালু করা দরকার।
এ ছাড়া সরকারি কলেজের মতো জনবলকাঠামো তৈরি করা, সরকারি শিক্ষকদের মতো পদোন্নতির ব্যবস্থা এবং আনুপাতিক হারে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড, নায়েম ও এনসিটিবি ইত্যাদি) যোগ্যতাসম্পন্ন বেসরকারি শিক্ষকদের লিয়েন বা প্রেষণে নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত ইউনেস্কো ও আইএলওর ১৯৬৬ সালের সনদ বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা সার্ভিস কমিশন’ গঠন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই স্থানীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
শিক্ষাঙ্গনে দলাদলি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দূর করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি প্রথা বিলুপ্ত করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনব্যবস্থা চালু করা জরুরি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা না করে জরিপের মাধ্যমে কেবল চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি বৈষম্য দূর করে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের কোনো বিকল্প নেই। তাই ইউনেস্কো ও আইএলওর সুপারিশমালার আলোকে সরকার সুপরিকল্পিতভাবে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করবে—বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এটাই প্রত্যাশা।
অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান
সাবেক কোষাধ্যক্ষ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সভাপতি, বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ।
*মতামত লেখকের নিজস্ব