গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া এক ভাষণে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জোর দিয়ে বলেন, ‘জাতিসংঘের অগণিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রীয়তা নিশ্চিত করাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের মূল ইস্যু এবং এটি সমাধানের সময় এসেছে।’

মস্কোর এই অবস্থানের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৪৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ফিলিস্তিন বিভাজন সমর্থন করে, তখন থেকেই ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয়তার প্রতি তাদের সমর্থন বজায় রয়েছে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে রুশ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেও এই নীতি অপরিবর্তিত আছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে রুশ ফেডারেশন ইসরায়েলি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের কোনো কার্যকর বা বস্তুগত সহায়তা প্রদান করেনি। তারা বড়জোর একটি ব্যর্থ দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনে কূটনৈতিক বুলি ছুড়েছে, আর একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার যে সংঘাত চলছে, সেখানে ইসরায়েল প্রকাশ্যে নিজেদের যুক্ত করার পরও রুশরা তাদের সামরিক জোট ও সম্পর্ক ত্যাগ করেনি। এই অকার্যকর দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন এবং ‘উভয় পক্ষকে সমানভাবে দেখা’র ভান করার মাধ্যমে রুশ ফেডারেশন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়েও দুর্বল অবস্থানে পৌঁছেছে। লাভরভের মতো অর্থহীন কূটনৈতিক ঘোষণাগুলো সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, বর্তমান যুদ্ধে ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন মূলত যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সোভিয়েতদের সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা কৌশলেরই একটি সংস্করণ। এর ফলে আরব জনগণের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার যে ধারা সোভিয়েত আমলে শুরু হয়েছিল, তা রাশিয়ার সময়ে আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

গত সাড়ে তিন দশকে রুশ ফেডারেশন নতুন কোনো পথ তৈরির বদলে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সমন্বয় বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু ফিলিস্তিনি এবং জায়নবাদের প্রতি তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে অস্বীকার করেছে। এই বাস্তবতার মাঝেও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, রাশিয়ার শাসকগোষ্ঠীর কেউ এখনো তাদের এই ব্যর্থ মধ্যপ্রাচ্য নীতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তনের কথা ভাবেননি।

ঐতিহাসিকভাবে রুশ বলশেভিকরা (খ্রিষ্টান ও ইহুদি উভয়ই) কেবল জায়নবাদেরই তীব্র বিরোধিতা করেননি, বরং লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড ও রাশিয়ার ‘জেনারেল জুয়িশ লেবার বুন্দ’–এর (যা সংক্ষেপে বুন্দ নামে পরিচিত) জায়নবাদবিরোধী ইহুদি জাতীয়তাবাদেরও বিরোধিতা করেছিলেন। রুশ বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর জায়নবাদের প্রতি এই বিরোধিতা রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে, ‘বুন্দবাদী’ ইহুদি জাতীয়তাবাদের প্রতি তাদের আগের বিরোধিতা কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। বুন্দ দ্রুত বিলুপ্ত হয় এবং এর অধিকাংশ সদস্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিপিএসইউ) যোগ দেয়। অনেক সাবেক বুন্দবাদী পার্টির সদস্য ইয়েভসেকসিয়া বা ইউনিয়নের ইহুদি শাখার কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন, যারা সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত (ইদ্দিশ) নীতিগুলো বাস্তবায়ন করেন। মূলত সিপিএসইউর ইহুদি শাখাই দেশে জায়নবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নে জায়নবাদী সংগঠন তৈরি করা অবৈধ ছিল এবং বিশিষ্ট সোভিয়েত ইহুদি ও খ্রিষ্টান ব্যক্তিরা প্রকাশ্য ভাষণে এই বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক আন্দোলনের তীব্র নিন্দা জানাতেন। তারা জায়নবাদীদের ঔপনিবেশিক হিসেবে বর্ণনা করতেন। ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে সোভিয়েত ও তাদের কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ব্রিটিশ ও জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিদ্রোহ করার অধিকারকে সমর্থন করেছিল এবং জায়নবাদীদের প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছিল।

তবে একই সময়ে সোভিয়েতরা ১৮ শতকের শেষের দিক থেকে শুরু হওয়া দেশের অভ্যন্তরে ইহুদি কৃষি উপনিবেশ গঠনে জারের পৃষ্ঠপোষকতার নীতি অব্যাহত রাখে। জারদের আমলে সাইবেরিয়া, দক্ষিণ রাশিয়া, ককেশাস এবং ক্রিমিয়ায় ইহুদি কৃষি বসতি স্থাপন করা হয়েছিল। রুশ বিপ্লবের সময় জারের শ্বেত বাহিনী এবং পশ্চিম ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকদের তাণ্ডবে ‘পেল অব সেটেলমেন্ট’ অঞ্চলটি তছনছ হয়ে যায়, যেখানে এক লাখের বেশি ইহুদি নিহত হন এবং অনেকের জীবিকা ধ্বংস হয়। সেই প্রেক্ষাপটে নবাগত সোভিয়েত সরকার ‘আমেরিকান জুয়িশ জয়েন্ট ডিস্ট্রিবিউশন কমিটি’-এর সঙ্গে যৌথভাবে দক্ষিণ ইউক্রেন, উত্তর ককেশাস, ভলগা অঞ্চল এবং ক্রিমিয়ায় ইহুদিদের জন্য কৃষি উপনিবেশ স্থাপনের নতুন প্রকল্প অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে, যা ১৯২৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল।

১৯৩৪ সালে স্থানীয় ক্রিমিয়ান তাতারদের বিরোধিতার কারণে সোভিয়েতরা সেখানে ‘ইহুদি’ প্রদেশ তৈরি করতে অস্বীকার করে এবং তার বদলে বিরোবিদঝান নামে একটি কম জনবহুল অঞ্চলে প্রদেশ তৈরি করে। এটি ছিল জায়নবাদবিরোধী ইহুদি জাতীয়তাবাদীদের সন্তুষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা। তারা মনে করত, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সোভিয়েত ইহুদিদের মূলধারায় একীভূত করার নীতিই ছিল বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক জায়নবাদের সেরা জবাব। অনেক ইহুদি কর্মকর্তা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করলেও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের (কমিনটার্ন) ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস কসপন্ডেন্স’–এ (ইনপ্রেকর) প্রকাশিত বিরোবিদঝানপন্থী একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছিল:

‘এখন প্রমাণ মিলেছে যে ইহুদিরা অন্য সব জাতির মতোই কঠোরতম শারীরিক অবস্থার মধ্যেও দূরদর্শী অগ্রদূত হিসেবে একটি অনুন্নত দেশকে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির দেশে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। সেখানে কোনো ‘আরব সংকট’ নেই, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব নেই, এক ইহুদিবিদ্বেষ থেকে অন্য ইহুদিবিদ্বেষে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সোভিয়েত শক্তির মাধ্যমে ইহুদি সংকটের এটাই আসল সমাধান।’

‘এমজেড’ নামের এক লেখকের লেখা প্রবন্ধটি ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ: বিরো বিজান, একটি স্বায়ত্তশাসিত ইহুদি প্রদেশ’ শিরোনামে ১৯৩৪ সালের ১ জুন ইনপ্রেকরের ১৪ নম্বর ভলিউমের ৩২ নম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এমনকি নরম জায়নবাদী ও কট্টর কমিউনিস্টবিরোধী হান্না আরেন্টও স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার বিপ্লব প্রথম এই [জায়নবাদী] দাবির ওপর আঘাত হেনেছে যে ইহুদি সংকটের সমাধান কেবল ফিলিস্তিনেই সম্ভব এবং ফিলিস্তিন গড়ে তোলার মাধ্যমে বা অন্য কথায় ইহুদিদের তাদের আগের পিতৃভূমি থেকে প্রস্থান করার মাধ্যমেই কেবল ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূল করা সম্ভব।’

সোভিয়েত ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জাতীয়তাবাদবিরোধী থেকে যায় এবং সোভিয়েত সমাজে একীভূত হওয়াকে সমর্থন করে। খুব সামান্য অংশ বিরোবিদঝানে বা কৃষি উপনিবেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়, বাকিরা রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের বড় শহরগুলোতে চলে যায়। তারা জায়নবাদী, বুন্দবাদী এবং সোভিয়েত-পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ইহুদি জাতীয়তাবাদের সব রূপকেই প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিরা সোভিয়েত সমাজে এতটাই একীভূত ছিল যে ১০০ জনের বেশি ইহুদি জেনারেল রেড আর্মিতে সেবা দিয়েছিলেন, যা ইহুদি বলশেভিক লিওন ট্রটস্কি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছিলেন।

১৯২৯ সালের ফিলিস্তিনি বুরাক দেয়াল (ওয়েস্টার্ন ওয়াল) বিপ্লবের পর, কমিনটার্নের ইস্ট বিভাগের উপপরিচালক জর্জি সাফোরভ ‘ফিলিস্তিনে জায়নবাদী উপনিবেশগুলোর’ তীব্র নিন্দা জানান এবং ‘ফিলিস্তিনের ইহুদি সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী অগ্রগামী দল’ বলে বর্ণনা করেন। তবে যুদ্ধের শেষে এবং হলোকাস্টের পর জোসেফ স্তালিন সম্পূর্ণ উল্টো নীতি গ্রহণ করেন। ব্রিটেন ও তুরস্কে সোভিয়েত দূতাবাসগুলোর জায়নবাদী লবিং কিছু সাহায্য করলেও তা মূল কারণ ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে প্রতিক্রিয়াশীল আরব রাজতন্ত্র এবং রক্ষণশীল ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমাদের সঙ্গে মিত্রতা করে, যা সোভিয়েতদের পছন্দ হয়নি।

জায়নবাদীদের নিজেদের সমাজতান্ত্রিক এবং স্নায়ুযুদ্ধে নিরপেক্ষ দাবি করার ভানটি সোভিয়েতদের একটি এক-রাষ্ট্র সমাধান বা ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার নীতি গ্রহণে রাজি করায়। ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই গ্রোমিকো মস্কো থেকে নতুন নির্দেশনা পান, যা আগের জায়নবাদবিরোধী অবস্থানকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। গ্রোমিকো ১৯৪৭ সালের মে ও নভেম্বরে আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন, যেখানে তিনি পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইহুদিদের সাহায্য করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দোষারোপ করেন এবং ফিলিস্তিনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের তথাকথিত অধিকার সমর্থন করেন।

ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর সোভিয়েতরা দ্রুত একে স্বীকৃতি দেয়, যা পুরো আরব বিশ্বের বৈরিতা অর্জন করে এবং সোভিয়েত লাইন অনুসরণকারী আরব কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে আরব জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সোভিয়েতরা যদি ভেবে থাকে যে তারা জায়নবাদীদের সমর্থন করে মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র পেয়েছে, তবে তারা দ্রুতই তাদের ভুল হিসাব বুঝতে পেরেছিল। তা সত্ত্বেও নিকিতা ক্রুশ্চেভের আমলে ১৯৫৪ সালের জুনে ইসরায়েলে সোভিয়েত কূটনৈতিক মিশনকে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে উন্নীত করা হয়। তবে ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে মিসর, ১৯৫৮ সালের পর ইরাক এবং ১৯৬২ সালের পর আলজেরিয়ার মতো আরব প্রজাতন্ত্রগুলোই ছিল সোভিয়েতদের জন্য সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন।

এই ইতিহাসের আলোকে রুশ ফেডারেশনের মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানের পরিবর্তনের আশা করা কঠিন। যতক্ষণ না তারা কৌশল পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ জায়নবাদী বসতি-উপনিবেশবাদ এবং ইসরায়েলি আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তারা একটি তাৎপর্যহীন উপাদান হিসেবেই থেকে যাবে। সোভিয়েতরা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও আরব প্রজাতন্ত্রের প্রতি তাদের সমর্থন ছিল পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমর্থনের তুলনায় অনেক হালকা।

আমেরিকা ও পশ্চিমাদের সঙ্গে ইসরায়েলের মিত্রতা এবং সোভিয়েতদের প্রতি শত্রুতা এতটাই তীব্র ছিল যে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধেই প্রচারণায় নামে। বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েতরাই কথায় ও কাজে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের গায়ে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’র তকমা এঁটে দেওয়া হয়। পশ্চিমা দেশের ইহুদিরা ইসরায়েলে স্থানান্তরিত হতে অস্বীকার করায় এবং অভিবাসন কমে যাওয়ায় ইসরায়েলিরা সোভিয়েত ইহুদিদের আনার চেষ্টা করে। সে প্রেক্ষাপটেই তারা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলে, কারণ সোভিয়েতরা ইহুদিদের ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছিল।

১৯৬৭ সালে তিনটি আরব দেশে ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর সোভিয়েতরা এই ইহুদি বসতি-উপনিবেশটির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। এরপর ইসরায়েল সোভিয়েত ‘ইহুদিবিদ্বেষের’ বিরুদ্ধে প্রচারণা আরও তীব্র করে, যার ফলে ১৯৭১ সাল থেকে সোভিয়েতরা বড় আকারের ইহুদি অভিবাসনের অনুমতি দেয়। দেশ ত্যাগ করা ব্যক্তিদের অর্ধেকই ইসরায়েলের বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছিল। এই শিথিলতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ প্রশমিত রাখার প্রচেষ্টার অংশ। মিখাইল গর্বাচেভ ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে অভিবাসন বিধিনিষেধ শিথিল করেন, যার ফলে ১০ লাখ সোভিয়েত ইহুদি ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার সুযোগ পায়।

গর্বাচেভ ১৯৯১ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই বছরের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের ‘জায়নবাদ একটি বর্ণবাদ’ প্রস্তাবটি বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়, যা তারা ১৯৭৫ সালে সমর্থন করেছিল। যদি জায়নবাদের ওপর স্তালিনের অবস্থান পরিবর্তন হলোকাস্ট, স্নায়ুযুদ্ধ ও সোভিয়েতপন্থী আরব শাসকদের অভাবের কারণে হয়ে থাকে, তবে বর্তমান পশ্চিমা যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা এবং ইরান ও লেবানন-ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান কি নতুন আরেকটি অবস্থান পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট হবে না?

এটি সত্য যে সমস্ত আরব শাসনব্যবস্থা আজও ১৯৪৮ সালের মতোই পশ্চিমাদের পকেটে রয়েছে, তবে তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রের একমাত্র খেলোয়াড় নয়। জায়নবাদী প্রকল্পের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন মূলত রুশ বিপ্লব এবং ‘আন্তর্জাতিক কমিউনিজম’-এর বিরুদ্ধে আঘাত হানার লক্ষ্যে ছিল। ইহুদিবিদ্বেষী চার্চিল তার ১৯২০ সালের ‘জায়নবাদ বনাম বলশেভিজম’ প্রবন্ধে ইহুদিদের ‘বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। রাশিয়ান বিপ্লবের বিজয়ের ঠিক পাঁচ দিন আগে ১৯১৭ সালে চার্চিলের তথাকথিত ‘জাতীয় ইহুদিদের’ সমর্থনে ব্রিটেনের বেলফোর ঘোষণা তৈরি করা হয়েছিল, যাতে বিপ্লবের প্রতি রাশিয়ান ইহুদিদের সমর্থন ঠেকানো যায়। তবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল।

গর্বাচেভের অধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের শেষ ভোটগুলোর একটি দিয়েছিল জায়নবাদকে পুনর্বাসিত করার পক্ষে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল পর্দা নামার ঠিক কয়েক দিন আগে ‘জায়নবাদ একটি বর্ণবাদ’ প্রস্তাব বাতিলের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে এটি সোভিয়েত যুগের জায়নবাদ-বিরোধিতাকে চিরতরে মুছে দেয়। এই ইতিহাসের আলোকে রুশ ফেডারেশনের মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তনের আশা করা উচিত নয়। যতক্ষণ না এটি তার মধ্যপ্রাচ্য কৌশল ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি জায়নবাদী বসতি-উপনিবেশবাদ এবং ইসরায়েলি আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামে একটি তাৎপর্যহীন উপাদান হিসেবেই থেকে যাবে।

জোসেফ মাসাদ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও ইতিহাসের অধ্যাপক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত।