গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হলো সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন এবং মানসম্মত জনসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস পায়। একই ধরনের সংকট দেখা দেয় যখন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানের পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)-এর মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল’ সংলাপের দ্বিতীয় দিনে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। ‘দ্য ডেমোক্রেসি কনভারসেশন: রিবিল্ডিং ট্রাস্ট ইন অ্যান এজ অব পোলারাইজেশন’ শীর্ষক অধিবেশনে গণতন্ত্র ও আস্থা পুনর্গঠনের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বক্তারা।
সেশনটিতে অংশ নেন বাংলাদেশের সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ভারতের মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের গবেষণা ফেলো স্মৃতি এস পাত্তানাইক, মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা, মালয়েশিয়ার সাবেক প্ল্যান্টেশন ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমোডিটিজ মন্ত্রী জুরাইদা কামারুদ্দিন এবং লাটভিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য সের্গেইস পটাপকিনস। নেপালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিশ্বাস বারাল পুরো অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন।
আলোচনার শুরুতে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন যে, যেকোনো সমাজের জন্য সামাজিক মূলধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই মূলধনের প্রধান ভিত্তি হলো আস্থা। তবে আস্থার এই সংকট কেবল নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা রাষ্ট্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, ‘এখন জাতিসংঘের ওপর কার আস্থা আছে? বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ওপর কার আস্থা আছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নের ওপরই–বা কার আস্থা আছে?’ তিনি মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে আঙুল তুলে কেবল তাদের দুর্বলতাগুলো তুলে ধরলে আসলে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সামগ্রিক সংকটটি আড়াল করা হয়।
আফ্রিকান দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি তুলে ধরেন মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা। তিনি জানান, আফ্রিকার অনেক দেশে দুর্নীতি ও অপশাসনের কারণে সেনা হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সাধারণত সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যেই চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। তাই তিনি প্রস্তাব করেন যে, দুই বছর পর সরকার পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হলে সেনা হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কমে আসতে পারে।
ভারতের গবেষক স্মৃতি এস পাত্তানাইক বলেন, সমাজে যখন গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে, তখনই বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে, যা মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবসরের পর সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো সুবিধাজনক পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয় বলে তিনি মত দেন।
মালয়েশিয়ার সাবেক মন্ত্রী জুরাইদা কামারুদ্দিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, দুর্নীতি সব দলের মধ্যেই বিদ্যমান। তবে যখন সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা দ্রুত কমে যায়।
অন্যদিকে, লাটভিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য সের্গেইস পটাপকিনস জানান, নব্বইয়ের দশকে তাঁদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ৯০ শতাংশের বেশি কার্যকর ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আগের চেয়ে অনেক কমেছে।
আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত ব্রেটন উডস-ভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা বর্তমানে এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো শক্তিগুলোর প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে এবং নতুন শক্তিগুলো সামনে আসছে। এই রূপান্তরের ফলে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, পরাশক্তি এবং সংঘাতপূর্ণ বা প্রান্তিক দেশগুলোর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এই মধ্যম শক্তির দেশগুলো ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শেক্সপিয়ারের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সবাইকে ভালোবাসো, কিন্তু সবাইকে বিশ্বাস করো না এবং কারও সঙ্গে অন্যায় করো না।’ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, গবেষক এবং জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।