দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত এক ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার বরুইতলা সেনহাটির বাসিন্দা ফিরোজ আলম শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করলেও আদালতের নথিতে দেখা যায়, তিনি একটি মারামারির মামলায় আত্মসমর্পণ করে দেশে জামিন নিয়েছেন। কয়েক মাস পর বিষয়টি আদালতের নজরে এলে এই জালিয়াতির রহস্য উন্মোচিত হয়।
চলচ্চিত্র ‘আয়নাবাজি’র মূল চরিত্র শরাফত করিম আয়না যেমন টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে জেল খাটেন, এই ঘটনাটি হুবহু তেমন না হলেও অন্য একজনকে শাওন সাজিয়ে জামিন নেওয়া হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে অনেকটা আদালতে ‘আয়নাবাজি’র মতোই বলা যায়।
এই জালিয়াতির ঘটনায় গত ৬ আগস্ট খুলনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। উক্ত মামলায় অন্যের পরিচয়ে প্রতারণা এবং জাল কাগজপত্র আসল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে ফিরোজ আলম শাওনকে, দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে তাঁর আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীকে এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলার প্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার রাতে শাওনের ভাই ফেরদৌস আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যদিও তিনি এজাহারভুক্ত আসামি নন, তবে আজ রোববার তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বরুইতলা ঘাট এলাকায় প্রতিবেশী মুন্সি তরিকুল আমিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ফিরোজ আলম শাওন ও তাঁর স্বজনদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে তরিকুল বাদী হয়ে শাওনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দিঘলিয়া থানা মামলাটি তদন্ত করে।
তদন্ত কর্মকর্তা দিঘলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জামিল হোসেন ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে শুধুমাত্র ফিরোজ আলম শাওনকে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে।
মামলার বাদী তরিকুল আমিনের আইনজীবী আজমল হোসেন জানান, আদালত যখন মামলার অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করেন, তখন তাঁরা জানতে পারেন যে গত ১৬ মার্চ শাওন জামিন নিয়েছেন। তরিকুল তখন আদালতকে অবহিত করেন যে, শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন এবং এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশে ফিরে আসেননি।
পরবর্তীতে গত ২৩ এপ্রিল তরিকুল আদালতে একটি আবেদন দাখিল করে জানান, শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করেও অন্য একজনকে শাওন সাজিয়ে আদালতে হাজির করে জামিন নিয়েছেন। এরপর ২৭ এপ্রিল আসামিপক্ষের আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীও আদালতে আবেদন করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বাদী আদালতে দাবি করেছেন যে শাওনের বদলে অন্য একজনকে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে এবং তিনি আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এই কারণে তিনি তাঁর ওকালতনামা ও জামিননামার ক্ষমতা প্রত্যাহারের আবেদন জানান। এরপর আদালতের পক্ষ থেকে শাওনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়।
গত ৭ জুলাই শাওনের পক্ষে অন্য একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নতুন ওকালতনামা জমা দিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের সঙ্গে তাঁর পাসপোর্টের ফটোকপি দাখিল করা হয়। পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করে আদালতের কাছে এটি স্পষ্ট হয় যে, ১৬ মার্চ যখন জামিন নেওয়া হয়েছিল, তখন শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছিলেন।
বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চতুর্থ আদালতের বিচারক ফাতেমা জান্নাত বিষয়টি অনুসন্ধান করেন। অনুসন্ধানে জামিন জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে গত ২২ জুলাই তিনি খুলনার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়, এ ঘটনার সঙ্গে আইনজীবী, আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। ভুল ব্যক্তিকে উপস্থাপন করে প্রতারণা, নাম ও স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং জাল কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপনের মতো ঘটনা ঘটেছে।”
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ আগস্ট আদালত এই প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার জন্য খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী ৬ আগস্ট সদর থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এসআই মেহেদী হাসান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মামলার মূল আসামি শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করেন। জানতে পেরেছি, গত বছর তিনি দেশে এসে ঝামেলায় জড়ান। মামলা হওয়ার পর আবার দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যান। হয়তো মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ভুয়া ব্যক্তিকে শাওন হিসেবে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছিল। এটা অবশ্য মারামারির মামলার অংশ, তাই আর মন্তব্য করব না।”
এসআই মেহেদী হাসান আরও জানান, এই ঘটনায় সদর থানায় হওয়া মামলার তদন্তে শাওনের ভাই ফেরদৌস আলমের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, অন্য আসামি আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলী আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন।