ক্যামেরার ক্লিক, চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট, গণমাধ্যমের নানা গল্প আর তরুণ প্রজন্মের অদম্য সৃজনশীলতায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) প্রাঙ্গণ। গত ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী এই উৎসবের আয়োজন করে বিইউপি-র গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা (এমসিজে) বিভাগ। ‘এমসিজে কার্নিভ্যাল ২০২৬’ নামের এই বিশেষ মেলাটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে বিভাগের তিনটি সক্রিয় সংগঠন—বিইউপি ফটোগ্রাফি সোসাইটি, বিইউপি ফিল্ম ক্লাব এবং বিইউপি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ক্লাব।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিইউপির ফ্যাকাল্টি অব সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ডিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকসার খান এবং এমসিজে বিভাগের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহমুদ হাসান। তিন সংগঠনের প্রতিনিধিদের বক্তব্য এবং তাঁদের বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
আলোকচিত্র প্রেমীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল ‘স্ফুরণ ৬.০’ নামের একটি বিশেষ প্রদর্শনী। দুই হাজারেরও বেশি জমা পড়া ছবির মধ্য থেকে বাছাই করা সেরা কাজগুলো এখানে প্রদর্শিত হয়। কেবল প্রফেশনাল ক্যামেরা বা মোবাইল ফটোগ্রাফিই নয়, প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও কার্টুন। পাশাপাশি আলোকচিত্রের ওপর একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। বিইউপি ফটোগ্রাফি সোসাইটির মডারেটর প্রভাষক হাসিব শাহ বলেন, ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তিনটি ক্লাব আয়োজিত এমসিজে কার্নিভ্যাল ছিল শিক্ষার্থীদের নিজেদের তুলে ধরা ও একে অপরের কাছ থেকে শেখার দারুণ সুযোগ। দেশের অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও পেশাজীবীদের বিচারক হিসেবে যুক্ত হওয়া প্রমাণ করে শিল্পের কোনো সীমানা নেই।’
চলচ্চিত্র অনুরাগী শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয় ‘বিইউপি ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’। এই প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪০টির বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ২০টি প্রামাণ্যচিত্র, ৫০টি বিজ্ঞাপন এবং ২৫টি চিত্রনাট্য জমা পড়ে। উৎসবের আকর্ষণ বাড়াতে ছিল কসপ্লে, সিনে কুইজ এবং চলচ্চিত্রবিষয়ক সেমিনার। সংগঠনের মডারেটর প্রভাষক মো. ইব্রাহিম আজাদ বলেন, ‘এমসিজে কার্নিভ্যাল শুধু প্রতিযোগিতা বা উৎসব নয়; এটি তরুণদের সৃজনশীলতা, সাহস ও ইতিবাচক চিন্তাকে সমাজের বৃহত্তর পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি উদ্যোগ। চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফি ও যোগাযোগের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা শুধু গল্প বলবে না; বরং দায়িত্বশীল ও মানবিক গল্পের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে।’
গণমাধ্যমের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গল্প বিনিময়ের জন্য আয়োজন করা হয় ‘বিইউপি মিডিয়াকম সামিট ২.০’। এই আয়োজনে মুখোমুখি হন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও মডেল জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী, ভ্রমণ কনটেন্ট নির্মাতা সুরভী ইয়াসমিন এবং রাজনৈতিক পডকাস্টার মামুনুর রশীদ। তাঁরা তাঁদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং সময়ের সাথে বদলে যাওয়া গণমাধ্যমের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমচর্চার কথা উল্লেখ করে অভিনেত্রী ঐশী ‘হলুদ সাংবাদিকতা ও চরিত্র হনন’ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, সুরভী ইয়াসমিন বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা এবং কমিউনিটি ট্যুরিজমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট নিগার ইশরাত বলেন, ‘সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই গণমাধ্যমজগতের বাস্তবতা ও পেশাগত পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের মিডিয়াকম সামিটের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা এবং তাঁদের পেশাগত যাত্রা, অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেওয়া।’
গল্প, সিনেমা এবং আলোকচিত্র—এই তিন ভিন্ন মাধ্যমের সৃজনশীলতার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা গেছে এই আয়োজনে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তরুণদের জন্য এই কার্নিভ্যালটি হয়ে উঠেছিল নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শনের, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এবং মিডিয়া জগতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য মঞ্চ।