ভারতের বর্তমান সরকার ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর উদ্দেশ্য হলো ‘উত্থিত ভারতের গতি রুদ্ধ করা’। ভারতের শাসক দল বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই মত প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই পুরো পরিস্থিতি আসলে ‘মার্ক্সবাদী, মাওবাদী ও ইসলামপন্থীদের ষড়যন্ত্র’।

আরএসএসের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘অর্গানাইজার’ সাময়িকীর একটি সম্পাদকীয়তে বর্তমানের এই বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চিত্রিত করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই ষড়যন্ত্রকারীদের মদত নিয়ে দেশে ভয়, ঘৃণা এবং নৈরাজ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা প্রকৃতপক্ষে গান্ধীবাদের এক নিকৃষ্টতম অবমাননা।

সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের একতা ও সংহতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে বিজেপি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জাতিগত, ভাষাগত এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সংহতি নষ্ট করার জন্য বিভিন্ন আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে গান্ধীজি এবং আম্বেদকরের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্গানাইজারের সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকর এই চক্রান্তের প্রমাণ হিসেবে তিনটি নির্দিষ্ট বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, আইআইটি বোম্বের এক ছাত্রের আত্মহনন, দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং তৃতীয়ত, ইউপিআই আদান–প্রদানের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা ‘এমডিআর’ নিয়ে বিতর্ক। প্রফুল্ল কেতকরের মতে, এই তিনটি বিক্ষোভেরই মূল লক্ষ্য হলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা ভারতকে টেনে নামানো। তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন, ‘কমিউনিস্ট–মাওবাদী–ইসলামপন্থী ষড়যন্ত্র’। তাঁর ভাষায় এটি এখন একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রে ক্ষোভ–বিক্ষোভ থাকবেই। দাবি আদায়ে সেটাই স্বাভাবিক। সে জন্য গান্ধী–আম্বেদকরের আদর্শ তুলে ধরা, অনুপ্রাণিত হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু এসব আন্দোলনে গান্ধী ও আম্বেদকরকে মার্ক্সবাদী ও মাওবাদীরা যেভাবে তুলে ধরছে, ব্যবহার করছে, সেটাই সমস্যা। এভাবে তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতপাতের ইস্যুকে সামনে টেনে আনছে। সরকারের প্রতি মানুষের মন বিষিয়ে দিতে চাইছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিতে চাইছে। দেশকে দুর্বল করার এই আখ্যান নবতম ট্রেন্ড।'

সম্পাদকীয়তে আরও দাবি করা হয়েছে যে, এই ষড়যন্ত্রে বিদেশের ভারতবিরোধী শক্তিগুলো অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তারা কেবল উৎসাহই দিচ্ছে না, বরং আর্থিক সহায়তাও প্রদান করছে। কিছু রাজনৈতিক দল তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের লোভে এই ফাঁদে পা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আইআইটি বোম্বের ছাত্রের আত্মহত্যার ঘটনার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ার মতো বিষয়কে জাতপাতের রঙ দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জাতপাত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ নেওয়ার অক্ষমতার কারণ অনুসন্ধান করাই হওয়া উচিত ছিল, বিক্ষোভ নয়। কিন্তু জাতপাতের বিষয়টিকেই বড় করে উসকে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে নির্বাচন কমিশন এবং ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও একটি চক্রান্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা থাকা সত্ত্বেও তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, যদিও এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে এবং অনেক দেশে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই অগ্রগতির বিরোধিতা করা এখন একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

দেশকে দুর্বল করার এই প্যাটার্নের তৃতীয় উদাহরণ হিসেবে ইউপিআই (নোটবিহীন ডিজিটাল প্রথায় অর্থ আদান–প্রদান) পেমেন্টের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। দুই হাজার রুপির বেশি বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হারে এমডিআর দেওয়ার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হচ্ছে, তার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে ইউপিআই এখন ভারতের এক অনন্য ব্র্যান্ড এবং বিশ্বজুড়ে ভারতীয় প্রযুক্তির কদর বাড়িয়েছে। এই অর্জনের কৃতিত্ব ধ্বংস করার জন্যই গণতান্ত্রিক অধিকারের দোহাই দিয়ে ‘ব্র্যান্ড ভারত’কে টেনে নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই চক্রান্তের পেছনে বিদেশি শক্তির মদত ও তহবিলের কথা বলা হয়েছে।

তবে লক্ষণীয় যে, ইউপিআই-তে এমডিআর চালুর যে বিরোধিতা আরএসএসের মুখপত্র করেছে, আরএসএস অনুমোদিত ও ঘনিষ্ঠ দক্ষিণপন্থী অর্থনৈতিক সংগঠন স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ আগে থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল। তাদের দাবি ছিল, এমডিআর চালু হলে ইউপিআই জনপ্রিয়তা হারাবে এবং মানুষ ভিসা বা মাস্টারকার্ডের দিকে ঝুঁকবে। পাশাপাশি, মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নেওয়া হয়েছে বলে বিরোধীরা সমালোচনা করছেন। তাদের অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপে ভিসা ও মাস্টারকার্ডের বাণিজ্যিক স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্গানাইজার যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, বিজেপি আগে থেকেই সেই পথ অনুসরণ করে আসছে। গত জুন মাসে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের সময় থেকেই বিজেপি একে ‘বিদেশি চক্রান্ত’ বলে দাবি করেছে। রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ কর্মসূচির বিরোধিতার ক্ষেত্রেও তারা একই যুক্তি দিয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, রাহুলের সব আন্দোলনের পেছনে ‘পাকিস্তান ও মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসের হাত’ রয়েছে।

অর্গানাইজারের ২৮ সেপ্টেম্বর সংখ্যার সম্পাদকীয়তে এবার কমিউনিস্ট, মার্ক্সবাদী ও মাওবাদীদের সাথে ইসলামপন্থীদের নাম যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই ট্রেন্ড ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন বা ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত চলবে। ‘ইসলামিস্ট’ শক্তির যোগসাজশের কথা উল্লেখ করায় ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনগুলোতেও বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল হিন্দু-মুসলমান, ভারত-পাকিস্তান, দেশপ্রেমিক-দেশবিরোধী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ-বিচ্ছিন্নতাবাদের আবর্তেই আবর্তিত হবে।