ফুটবল ক্যারিয়ারে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা একজন খেলোয়াড়ের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। কাভান সুলিভানের জন্য গত শনিবারের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই এক স্মরণীয় মুহূর্ত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার ইতিহাস গড়েছেন।

মেক্সিকোর বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে জয়লাভের পথে সুলিভান গোল করেন মাত্র ১৭ বছর ৫ দিন বয়সে। মজার ব্যাপার হলো, এই রেকর্ডটি অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী ছিল। মাত্র কয়েক দিন আগেই তাঁর সতীর্থ ম্যাথিস আলবার্ট এই রেকর্ডটি গড়েছিলেন। গত মঙ্গলবার চিলির বিপক্ষে ১৭ বছর ১৩১ দিন বয়সে গোল করেছিলেন আলবার্ট। তবে সুলিভান সেই রেকর্ড ভেঙে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

ম্যাচের ৬২ মিনিটে সুলিভানের সেই অসাধারণ গোলটি আসে। মেক্সিকোর গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেলের একটি ভুল পাসে বল পেয়ে সুলিভান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে চিপ করে বল জালে পাঠান। এই গোলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। ম্যাচের প্রথম গোলটি করেছিলেন জুলিয়ান হল এবং তৃতীয় গোলটি করেন মালিক টিলম্যান। যদিও ম্যাচে তিনজন গোলদাতা ছিলেন, তবে সুলিভানের রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্সই সব আলো কেড়ে নিয়েছে।

সুলিভানের এই সাফল্যে মুগ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিন। মেক্সিকোর বিপক্ষে জয়ের পর তিনি বলেন, ‘সুলিভান একজন যোদ্ধা। এমন খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়া কঠিন। বল পায়ে ও অসাধারণ। বল দখলে রাখার ওর যে অসাধারণ দক্ষতা, তা অবিশ্বাস্য। এমন একজন খেলোয়াড় দলে থাকা দারুণ ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অসাধারণ খবর। আশা করি, সুলিভান এভাবেই এগিয়ে যাবে এবং আরও উন্নতি করবে।’

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আনন্দে আত্মহারা সুলিভান। ম্যাচ শেষে টিএনটি স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘আপনি যখন তিন, চার, পাঁচ কিংবা ছয় বছর বয়স থেকে এমন মুহূর্তের স্বপ্ন দেখেন, তখন এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি শুধু গত কয়েক ঘণ্টা নয়, সারা জীবন এই মুহূর্তের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছি।’

নিজের এই অর্জনে পরিবার এবং কোচদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সুলিভান বলেন, ‘আমার পরিবার ও আমার জন্য এটি অবিশ্বাস্য এক মুহূর্ত। এমন সুযোগ পাওয়া সত্যিই সম্মানের। কোচরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন এবং এই সুযোগ দিয়েছেন। এ জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।’

জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম গোলের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে সুলিভান বলেন, ‘(গোলের পর) যেন সবকিছু হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যায়। শুধু মনে আছে, বলটা চিপ করেছিলাম। আশা করছিলাম, ক্রসবারে লাগবে না বা ওপর দিয়ে চলে যাবে না। বলটা যখন আকাশে ছিল, তখন একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। এরপর সবকিছু যেন চোখের পলকে ঘটে গেল।’

সুলিভানের রেকর্ড গড়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে। ১৭তম জন্মদিনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে তাঁর অভিষেক হয়, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে খেলার রেকর্ড। ক্লাব ফুটবলেও তিনি ইতিহাস গড়েছেন। মাত্র ১৪ বছর ২৯৩ দিন বয়সে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে এমএলএসে অভিষেক করে তিনি হয়ে যান এই লিগের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। শুধু এমএলএস নয়, উত্তর আমেরিকার যেকোনো বড় পেশাদার লিগে এত কম বয়সে অভিষেকের রেকর্ডও তাঁর দখলে।

চলতি মৌসুমে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে কাটছে সুলিভানের সময়, যা তাঁকে জাতীয় দলের মূল আলোচনায় নিয়ে এসেছে। সর্বশেষ ৮টি এমএলএস ম্যাচে তিনি ৬টি গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন। তাঁর এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে ফিলাডেলফিয়া টানা ১২ ম্যাচ অপরাজিত থেকে নতুন ক্লাব রেকর্ড গড়েছে।

সুলিভানের সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও। লিওনেল মেসির মতো বিশ্বসেরা তারকাকে পেছনে ফেলে তিনি এই সম্মান অর্জন করেন। ওই মাসে ৪টি ম্যাচে ৪ গোল ও ৫ অ্যাসিস্টসহ মোট ৯টি গোলের অবদান রাখেন তিনি। এমএলএসের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে মাসসেরার পুরস্কার জিতে প্রমাণ করলেন যে, রেকর্ড গড়া তাঁর জন্য এখন নিয়মিত ব্যাপার।