বঙ্গোপসাগরে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, অবৈধ ট্রলিং এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপপ্রয়োগের ফলে চরম হুমকির মুখে পড়েছে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ। সমুদ্রের তলদেশ থেকে মাছের পোনা, শামুক, ঝিনুক এবং সামুদ্রিক শৈবালসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ ধ্বংস করছে এসব ট্রলিং জাহাজ। এর ফলে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ ট্রলিংয়ের কারণে ব্যাপক আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন উপকূলীয় সাধারণ জেলেরা।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিল্পভিত্তিক ট্রলিং জাহাজের জন্য ৪০ মিটার গভীরতায় মাছ ধরার অনুমতি থাকলেও অভিযোগ উঠেছে যে, নিয়ম অমান্য করে মাত্র ৮ মিটার গভীরতায় মাছ শিকার করছে কিছু ট্রলিং জাহাজ। বরগুনার পাথরঘাটা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবৈধভাবে মাছ শিকারের এমন দৃশ্য স্থানীয় জেলেরা ধারণ করেছেন।
জেলেদের অভিযোগ, এসব জাহাজের বিধ্বংসী জালে মাছের পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশে থাকা শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল, প্রবাল ও সাগরঘাস উঠে আসে। অথচ এই জলজ উপাদানগুলো মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য এবং প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র।
এফবি রাইসা ট্রলারের মাঝি আনোয়ার হোসেন বলেন, “অবৈধ ট্রলিং জাহাজের কারণে আমি ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ছেন। মাছ শিকারের সময় এসব জাহাজ জাল ও দড়ি কেটে দেয়। প্রতিবাদ করলে উল্টো আরও বেশি ক্ষতি করে।” তিনি জানান, এর ফলে প্রতিনিয়ত আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ জেলেরা।
এফবি জুনায়েদ ট্রলারের জেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, “অবৈধ ট্রলিং জাহাজের নিষিদ্ধ জালে ছোট ইলিশের পোনা থেকে শুরু করে ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির মাছের পোনা মারা যাচ্ছে। জাহাজগুলো নিজেদের পছন্দমতো মাছ রেখে বাকি মৃত মাছ সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে।” এতে সামুদ্রিক মাছের ভবিষ্যৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
সমুদ্রগামী আরেক জেলে শফিকুল ইসলাম জানান, এসব জাহাজের কারণে সাধারণ জেলেরা আর নিরাপদে মাছ শিকার করতে পারছেন না। তাদের জাল নষ্ট হওয়া, মাছ ধরার জায়গা সংকুচিত হওয়া এবং মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরকে ম্যানেজ করে অবৈধ ট্রলিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে বৈধভাবে মাছ শিকার করা ট্রলার মালিকেরা লোকসানে পড়ছেন।” তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতির কারণে অনেকেই মাছের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, “ট্রলিং জাহাজের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনের একাধিক প্রমাণ পেয়েছি। অবৈধভাবে ট্রলিং করে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, যান্ত্রিকভাবে টেনে মাছ ধরার জাল সমুদ্রে মাছ শিকারের অন্যতম বিধ্বংসী পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশ এবং মাছের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।