শহরের ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে শেরপুরের গণগ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক প্রশান্তির দৃশ্য। কেউ নিবিষ্ট মনে বই পড়ছেন, কেউবা উল্টাচ্ছেন সংবাদপত্রের পাতা। কেউ চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মগ্ন, আবার কেউ কম্পিউটারের পর্দায় খুঁজছেন প্রয়োজনীয় তথ্য। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন পাঠক ভিড় করেন শেরপুরের খান বাহাদুর ফজলুর রহমান জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারে।

গত এক শতাব্দী ধরে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সফলভাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সময়ের প্রয়োজনে এখানে যুক্ত হয়েছে নতুন বই, সাময়িকী, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সুবিধা। তবে দীর্ঘ এই সময়েও প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত রয়েছে—আর তা হলো মানুষকে বইয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসা।

চাঁদা ভিত্তিক শুরু

১৯২৬ সালে একটি বেসরকারি ‘রিডিং ক্লাব’ হিসেবে এই গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ে মাসিক চাঁদার বিনিময়ে সদস্যরা দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা পড়ার সুযোগ পেতেন। বই বাড়িতে নিয়ে পড়ার ব্যবস্থাও ছিল তখন, তবে তার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জামানত জমা দিতে হতো।

১৯৮৪ সালে দানবীর খান বাহাদুর ফজলুর রহমানের স্বজনেরা শহরের মাধবপুরে গ্রন্থাগারের জন্য জমি দান করেন। এরপর বর্তমান স্থানে গ্রন্থাগারটি স্থানান্তর করা হয় এবং এর নামকরণ করা হয় ‘খান বাহাদুর ফজলুর রহমান গণগ্রন্থাগার’। পরবর্তীতে জেলা পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠানটি সরকারি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯১ সালের জুলাই মাস থেকে রাজস্ব বাজেটের আওতায় এটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘খান বাহাদুর ফজলুর রহমান জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, শেরপুর’।

৪৮ হাজারের বেশি বইয়ের সংগ্রহ

মাধবপুরে ৩৩ শতক জমির ওপর নির্মিত একতলা ভবনে এই গ্রন্থাগারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখানে রয়েছে দুটি পাঠকক্ষ। বর্তমানে গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা ৪৮ হাজারের বেশি। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি, জীবনী এবং সাধারণ জ্ঞানসহ নানা বিষয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে এখানে। শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও সাধারণ পাঠক তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব বই পড়ছেন।

এখানে পুরোনো সংবাদপত্র ও সাময়িকীর এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এছাড়া মুক্তকণ্ঠ, যুগান্তর, সমকাল, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন পাঠকেরা।

প্রতিদিন ৫০–৬০ জন পাঠক

গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন পাঠক এখানে আসেন। বর্তমানে নিবন্ধিত সদস্যের সংখ্যা ১ হাজার ১২ জন। বই বাড়িতে নিয়ে পড়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের জামানতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পাঠক রিফাতুল জান্নাত বলেন, ‘মাস্টার্স শেষ করেছি। এখন চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছি। এইচএসসি থেকে এ গ্রন্থাগারে নিয়মিত আসি। আমার সঙ্গে আরও ২০ থেকে ২৫ জন নিয়মিত আসেন। গল্পের বই পড়ি, চাকরির জন্য তথ্য খুঁজি। এখানে চমৎকার পরিবেশ।’

বইয়ের সঙ্গে প্রযুক্তির মেলবন্ধন

সময়ের সাথে সাথে পাঠকদের চাহিদাও পরিবর্তিত হয়েছে। তাই বইয়ের পাশাপাশি গ্রন্থাগারে যুক্ত করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক সুবিধা। এখানে পাঁচটি কম্পিউটার রয়েছে এবং নিবন্ধিত সদস্যরা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পান। এছাড়া গ্রন্থাগার চত্বরে তাঁরা ওয়াই-ফাইও ব্যবহার করতে পারেন।

বইয়ের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগও পাচ্ছেন পাঠকেরা। পাঠক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইন্টারনেটের যুগে সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকে। তবে এই গণগ্রন্থাগারে পাঠকেরা নিয়মিত বই ও পত্রিকা পড়েন। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিতে গ্রন্থাগারটি সরব হয়ে ওঠে। বিষয়টি দেখতে ভালো লাগে।

শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন

শিশু-কিশোরদের জন্য এখানে আলাদা ‘শিশু কর্নার’ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে রচনা, বইপাঠ, চিত্রাঙ্কন, পুঁথিপাঠ, আবৃত্তি ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

এ ছাড়া গ্রন্থ প্রদর্শনী, কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয় নিয়মিত। গ্রন্থাগারের সেবা শহরের বাইরে পৌঁছে দিতে জেলার চারটি উপজেলার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ৪৮টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিও পরিচালিত হচ্ছে।

জায়গার সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

গ্রন্থাগারে বর্তমানে আটজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঠকসেবার সঙ্গে যুক্ত। বই সংরক্ষণ, পাঠকসেবা, বই লেনদেন এবং তথ্য অনুসন্ধানসহ দৈনন্দিন যাবতীয় কার্যক্রম তাঁরা পরিচালনা করছেন।

ওই গণগ্রন্থাগারের সহকারী পরিচালক ও গ্রন্থাগারিক সিরাজাম মনিরা বলেন, ‘পাঠকদের জন্য একটি সুন্দর ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছি। পাঠকের উপস্থিতি আমাদের মুগ্ধ করে। তবে জায়গার অভাবে অনেক কর্মসূচি ছোট পরিসরে করতে হয়। ভবনটি দোতলা করা হলে আরও সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে। এ ছাড়া নিরাপত্তার জন্য এখানে সিসিটিভি ক্যামেরার সার্বক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থাও আছে।’

বইয়ের আবেদন এখনো অমলিন

মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবল ব্যস্ততার এই সময়ে বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখা বেশ কঠিন। তবু এই গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিনের পাঠকের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে—প্রযুক্তির যুগেও বইয়ের আবেদন অমলিন।

শতবর্ষের এই গণগ্রন্থাগার তাই শুধু বই রাখার জায়গা নয়; এটি শেরপুরের এক শতাব্দীর পাঠচর্চা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানসাধনার এক অনন্য স্মারক। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হলে এই পাঠাগার নতুন প্রজন্মকে বইয়ের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করবে—এমনটাই প্রত্যাশা পাঠক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।