২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এসেছিল এক কনটেইনার থিনার। দাহ্য এই রাসায়নিকটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আমদানিকারক তা খালাস নিতে রাজি হননি। এরপর দীর্ঘ বছর অতিবাহিত হয়েছে। একের পর এক জাহাজ এসেছে এবং গিয়েছে, সময়ের সাথে সাথে বন্দরের দৃশ্যপটও বদলেছে, কিন্তু ওই কনটেইনারটি পড়ে ছিল ঠিক সেখানেই।
অবশেষে দীর্ঘ ২৩ বছর পর গত শনিবার সেই কনটেইনারটি বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর গন্তব্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। সেখানে অবস্থিত একটি কারখানায় পরিবেশসম্মত উপায়ে এই রাসায়নিকটি ধ্বংস করা হবে।
শুধুমাত্র ওই থিনার নয়, একই সঙ্গে বন্দর থেকে আরও আটটি কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৯টি কনটেইনারে প্রায় ১৫১ টন থিনার, সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড ও মিথানল রয়েছে।
কাস্টমসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চালনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটি ছিল থিনারের। দুটি কনটেইনারে মোট ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার ছিল, যার একটি এসেছিল ২০০৩ সালে এবং অন্যটি ২০১৬ সালে। এছাড়া ২০১৪ সালে আসা একটি কনটেইনারে ছিল প্রায় ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড। ২০১৬ সালে আমদানি করা একটি কনটেইনারে ছিল প্রায় ২৬ টন সালফিউরিক অ্যাসিড। অন্যদিকে, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে আসা পাঁচটি কনটেইনারে ছিল প্রায় ৯৩ টন মিথানল। অর্থাৎ, ধ্বংসের জন্য সরিয়ে নেওয়া এই রাসায়নিকগুলোর মধ্যে কোনোটি বন্দরে পড়ে ছিল ২৩ বছর, আবার কোনোটি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ধ্বংস কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে রাসায়নিকবাহী যানগুলো বন্দর ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়। যেহেতু এই রাসায়নিকগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাই পুরো বহরের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ প্রহরা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় কর্তৃপক্ষ, রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের (বিএনএসিডব্লিউসি) সুপারিশ এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ধ্বংস কমিটির যৌথ উদ্যোগে এসব রাসায়নিক বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাসেল আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়ায় ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় রাসায়নিকগুলো পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে ধ্বংস করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।”
বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে ধ্বংস করার পুরো কার্যক্রমে মোট ১২টি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। বিএনএসিডব্লিউসি ও কাস্টমসের পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ায় রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আনসার ব্যাটালিয়ন। এই সংস্থাগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেড এই রাসায়নিকগুলো ধ্বংস করার দায়িত্ব নিয়েছে। সালফিউরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক প্রস্তুতকারী এই প্রতিষ্ঠানটি এই বিশেষ কাজের জন্য কোনো অর্থ গ্রহণ করবে না।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, বিপজ্জনক রাসায়নিক দীর্ঘদিন বন্দরের ভেতরে পড়ে থাকলে একদিকে যেমন মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়, অন্যদিকে এই কনটেইনারগুলো বন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখে। এই কারণেই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী এ ধরনের পণ্য শনাক্ত করে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।