দেশের সম্প্রচার সাংবাদিকতায় স্বতন্ত্র সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিত্রগ্রহণে নান্দনিকতার এক অনন্য রূপকার মিশুক মুনীর। তাঁর এই সৃজনশীল অবদানকে স্মরণ করে আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত বেঙ্গল শিল্পালয়ে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। লিলি-মুনীর স্মৃতি রক্ষা ট্রাস্ট এবং মিশুক মুনীরের পরিবারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে এ বছরের ‘মিশুক মুনীর স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করা হয়।
একটি বিশেষ জুরিবোর্ডের চুলুকানো মূল্যায়নের পর এবার শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক হিসেবে পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক লাভ করেন বরকত হোসেন পলাশ। অনুষ্ঠানে মিশুক মুনীরের ভাই আসিফ মুনীর বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক আবুল খায়ের লিটু তাঁর হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন।
পুরস্কার প্রাপ্তির পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন পলাশ বলেন, ‘এত সম্মানজনক একটি পুরস্কার পাওয়ার পর নিজেকেই খুব নগণ্য মনে হচ্ছে। মিশুক মুনীরের মতো পথিকৃৎদের পথ অনুসরণ করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আবুল খায়ের লিটু মিশুক মুনীরের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার নানা স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, মিশুকের রুচিবোধ, সৃজনশীলতা ও সবকিছু পরিপাটি করে সাজানোর গুণ ছোটবেলা থেকেই তাঁকে মুগ্ধ করত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মিশুককে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাঁর কাজ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রনির্মাতা আকা রেজা গালিব তাঁর বক্তব্যে বলেন, মিশুক মুনীর কেবল একজন ক্যামেরাশিল্পী ছিলেন না; টেলিভিশন সাংবাদিকতায় সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতেও তাঁর বড় অবদান ছিল। বিবিসির কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে তাৎক্ষণিকভাবে ধারণ করার পাশাপাশি মিশুকের একটি স্বতন্ত্র নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এছাড়া বেসরকারি একুশে টেলিভিশনে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের হাতে-কলমে কাজ শেখানোর ক্ষেত্রে মিশুকের ভূমিকা ছিল অনন্য।
‘মিশুক আমাদের সঙ্গেই থাকে’ শিরোনামের স্মৃতিচারণ পর্বে সাংবাদিক কুর্রাতুল-আইন-তাহ্মিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার সময়ের কথা মনে করে বলেন, মিশুক ছিলেন প্রাণবন্ত মানুষ এবং তাঁর পর্যবেক্ষণশক্তি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। পেশাগত জীবনে মিশুক তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘মিশুক আমাদের সঙ্গেই থাকে, চিরকাল থাকবে।’
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ও লেখক আফসান চৌধুরীর একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, মিশুক মুনীর ও চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদের কাজের মধ্যে যে সাহসিকতা ও স্বাধীনচেতা মনোভাব ছিল, তা-ই তাঁদের স্বাতন্ত্র্য গড়ে দিয়েছিল। মিশুকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দুই ভাইয়ের মতো।
মিশুক মুনীরের ভাই আসিফ মুনীর জানান, মিশুকের কাজ ও সৃজনশীল চেতনাকে সম্মান জানানোর লক্ষ্যেই এই আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মিশুকের প্রতি যে সম্মান ও ভালোবাসা থেকে অনেকে তাঁদের কাজ নিয়ে এই আয়োজনে আবেদন করেছেন, সেই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও ধরে রাখার চেষ্টা থাকবে।’
নাট্যব্যক্তিত্ব ত্রপা মজুমদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন মিশুক মুনীরের বড় ভাই আহমেদ মুনীর, লেখক মাহফুজা শিলু এবং চলচ্চিত্রনির্মাতা আবির শ্রেষ্ঠ। অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বরকত হোসেন পলাশের কাজের কিছু অংশ এবং মিশুক মুনীরের কর্মময় জীবন নিয়ে নির্মিত একটি সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
উল্লেখ্য, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী ও বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব লিলি চৌধুরীর দ্বিতীয় সন্তান মিশুক মুনীর ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং আন্তর্জাতিক মানের চিত্রগ্রাহক। বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সম্প্রচার সাংবাদিকতার রূপকার হিসেবে তিনি পরিচিত। চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদের ‘আদম সুরত’ থেকে শুরু করে ‘রানওয়ে’ পর্যন্ত অধিকাংশ চলচ্চিত্রের প্রধান চিত্রগ্রাহক ছিলেন তিনি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণকাজের দৃশ্য ধারণেও তাঁর ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। ২০১১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর ২০২৩ সাল থেকে এই স্মৃতি পুরস্কার চালু করা হয়। প্রথমবার ২০২৩ সালে সেরা প্রতিবেদক হিসেবে শাকিল হাসান এবং সেরা চলচ্চিত্রকার হিসেবে মাসউদুর রহমান এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।