ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি শিগগিরই ঘোষণা হবে। কমিটিতে কারা থাকবে, এ নিয়ে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, নতুন কমিটিতে সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে আলোচনায় রয়েছেন চারজন। তারা হলেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান এবং ঢাকা উত্তর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার।
এ পদে আরও দুই নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক নেতা সাইফুল আলম নীরব এবং এস এ সিদ্দিকী সাজু।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে গত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের বহিষ্কার করা হয়েছিল।
সাধারণ সম্পাদক বা সদস্য সচিব পদে আলোচনায় রয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সদস্য সচিব মোস্তফা জামান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আফাজ উদ্দিন।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিকে আরও শক্তিশালী, গতিশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। রাজনৈতিক সংগঠনে পুনর্গঠন একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া। নতুন কমিটিতে রাজপথের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে আমি আশাবাদী।’
নতুন কমিটি কবে নাগাদ হতে পারে? এমন প্রশ্নে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার কাছে অফিশিয়ালি এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসবে। এটি চলমান প্রক্রিয়া।’
এ ছাড়া বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।
দলীয় নীতি-নির্ধারকদের সূত্রে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্বে আসবেন তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতারা। বিশেষ করে যারা অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই এমন ক্লিন ইমেজের নেতাদের সামনে নিয়ে আসা হবে। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফের সচল করা হবে। মূলত রাজধানীতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত মজবুত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাম্প্রতিক একাধিক বিতর্কিত ঘটনার জেরে এ সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। পাশাপাশি যুবদল ও ছাত্রদলের শাখা কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। বহিষ্কার করা হয় বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের অন্তত ১৫ নেতাকে।
ঢাকা উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে শুধু ‘নিয়মানুগ নির্দেশক্রমে’ কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় সম্প্রতি ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার, পুলিশ ও সিটি করপোরেশন কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় অগ্নিসংযোগও ঘটে। এতে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠে।
পরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ঘটনাগুলো তদন্ত করা হয়। এতে বিশৃঙ্খলাকারীদের আশ্রয়দাতা হিসেবে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ ছাড়া মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও স্থানীয় পর্যায়ের চাঁদাবাজিতে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। পল্লবী, মিরপুর ও দারুস সালাম এলাকায় ঝুট ব্যবসা, জবরদখল ও নানা অপকর্মেও সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। এসব ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে মামুন নামে এক ব্যক্তি মিরপুরে একটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন। দেশে তার দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমান ওই বাহিনী পরিচালনা করেন। পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, জমি দখল ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তারা ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আমিনুল হক এবং সদস্যসচিব মো. মোস্তফা জামানের অধীন ৫১ সদস্যের কমিটি মেয়াদ পার করেছে। এরপরও কমিটি সাংগঠনিক ভিত্তি জোরদার করতে পারেনি। সামগ্রিক বাস্তবতায় কমিটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় দলের হাইকমান্ড।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকে কেবল ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিই নয়, সহযোগী সংগঠনগুলোতেও বড় ধরনের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের বিদ্যমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলায় শাহ আলী থানা বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং শ্রমিক দলের ১৫ নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরকার, জাতীয় সংসদ এবং দলের নেতাকর্মীদের উচ্চপর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দল, সরকার কিংবা সংসদে তার সমর্থক বা দলের কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। যেকোনো অপকর্মের জন্য যে শাস্তি প্রাপ্য, তাকে তা পেতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় বা বিরোধী দলে যেখানেই থাকুক, কেউ আইনের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হতে পারবে না।’
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আইনের বাইরে গেলে তার জন্য আইন অপেক্ষা করবে না। অনিয়ম ও অপরাধে জড়ালে তার পরিণতি কী হবে, এ সমস্ত ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই তার প্রমাণ হয়েছে।’