ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের চাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় জামালপুরে শোকের ছায়া নেমেছে। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সংঘটিত এই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের একই পরিবারের চারজন রয়েছেন। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে নিহতদের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
সকাল ৯টায় রানাগাছা ইউনিয়নের ঘোড়াকান্দা গ্রামে মর্জিনা বেগম ও তার পাঁচ বছরের ছেলে মিনালের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাদের পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়। সকাল ১০টায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মোফাজ্জল হোসেন লেবু ও তার ৮৫ বছর বয়সী মা রাশিদা বেগমের জানাজা শেষে দাফন করা হয়। এরপর শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচান্দি গ্রামে আকরাম আলী ও তার স্ত্রী মমতা বেগমের জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়। এছাড়াও, শুক্রবার রাতে সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দী গ্রামে সিএনজি চালক সুজন মিয়ার জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছিল।
দুর্ঘটনায় নিহত একই পরিবারের চারজন হলেন- দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন লেবু, তার মা রাশিদা বেগম, ২৫ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা বেগম এবং মর্জিনার পাঁচ বছরের ছেলে মিনাল। স্বজনরা জানান, পেশায় রাজমিস্ত্রি ৫৫ বছর বয়সী মোফাজ্জল হোসেন লেবু স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে গাজীপুরের হুতাপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। মা, মেয়ে ও নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা বাড়ি থেকে বের হন। নান্দিনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে প্রথমে ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা।
একই পরিবারের চারজনকে হারিয়ে স্বজনরা এখন শোকে বাকরুদ্ধ। চারটি খাটিয়া, চারটি কবর আর স্বজনদের আহাজারিতে দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া ও ঘোড়াকান্দা গ্রামের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। একই পরিবারের চার সদস্যকে দুই বাড়িতে দাফনের ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যেও নেমে এসেছে গভীর শোক। আর সাত জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত পুরো জামালপুর।
নিহত মোফাজ্জল হোসেন লেবুর স্বজন ইসমতারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "লেবু গাজীপুরে দিনমজুরের কাজ করতেন। শাশুড়ি, ভাতিজি ও নাতিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। একসঙ্গে সবাইকে হারিয়ে তারা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।"
স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ ফারাজি বলেন, "আগে টেলিভিশনে একই পরিবারের কয়েকজনের মৃত্যুর খবর দেখেছেন। এবার নিজের এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। একই পরিবারের চারজনসহ এত মানুষের মৃত্যুতে পুরো এলাকাবাসী শোকে স্তব্ধ।"
দুর্ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাজীব পরিবহনের বাস ও চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ ওয়ারেছ আলী মামুন জানাজার নামাজে অংশ নিয়ে বলেন, "নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হবে। এছাড়া সবার সঙ্গে বসে দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।"
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত ২০ মাসে রাজীব পরিবহনের বাসের কারণে ৯টি দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।