জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার ব্রুকস রেঞ্জ পাহাড়ি এলাকার নদীগুলোর পানিতে অদ্ভুত কমলা রঙের মরিচার আস্তরণ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি 'এজিইউ অ্যাডভান্সেস' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বরফ গলে যাওয়ার কারণে নদীর পানিতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি ধাতু ও বিষাক্ত পদার্থ মিশে যাচ্ছে।

আলাস্কার ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের কর্মকর্তা জন ও’ডোনেল জানান, প্রথম ২০১৮ সালে এই অদ্ভুত কমলা রঙের স্রোত লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গম এলাকা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের গবেষক টেলর ইভিঞ্জারের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর পানি দূষণের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে পারমাফ্রস্ট বা চিরস্থায়ী বরফ গলে যাওয়া। হাজার বছর ধরে বরফের নিচে আটকা পড়ে থাকা খনিজ পদার্থগুলো এখন নদীর পানিতে মিশছে, যার ফলে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্রুকস রেঞ্জের ছয়টি ভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত নমুনার পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষক দলটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

স্যামন নদীতে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই দূষণের ফলে পানির ধাতবমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা উৎস থেকে ৬০ মাইল দূরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৯ সালে আলাস্কায় উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল এবং পরবর্তীতে রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাতের ফলে মাটির গভীরে পানি প্রবেশ করে ওই খনিজগুলোর সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়েছিল।

গবেষক টেলর ইভিঞ্জারের মতে, "অতিরিক্ত তুষারমাটি ঢেকে রেখে আবার বরফ হতে বাধা দেয়, যার ফলে পানির গভীর পর্যন্ত চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হয়।"\ এর ফলে নদীগুলোর পানিতে সালফেট ও জিঙ্কের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়, যা জলজব্যবস্থা এবং উদ্ভিদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। উত্তর আমেরিকার পারমাফ্রস্ট অঞ্চলে এ ধরনের দুই শতাধিক নদী ও স্রোতোধারায় 'অ্যাসিড রক ড্রেনেজ' বা অম্লীয় শিলা নিষ্কাশনের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

কানাডার কার্লটন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী এলিয়ট স্কিয়ার্সজকান জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার এই পরিণতি জলসম্পদ এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। নদীর পানির অম্লত্ব এবং বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতির কারণে সংলগ্ন এলাকার গাছপালা মারা যাচ্ছে এবং স্যামনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে স্থানীয় আদিবাসীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।