বিদেশভ্রমণের জন্য বিমানের টিকিট কেনায় বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনযোগ্য কার্ডে ৩০০ মার্কিন ডলারের সীমা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ভালো, সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)সহ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এই সীমা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতায় টিকিট কেনার ক্ষেত্রে ৩০০ ডলারের সীমা একেবারেই যৌক্তিক ছিল না।

অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সীমা প্রত্যাহার করেছে। ফলে বাংলাদেশে আসা ও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া—উভয় ধরনের পর্যটনের গতি বাড়বে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবসাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

তবে সিদ্ধান্তের সুফল পুরোপুরি পেতে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও কার্যকারিতা স্পষ্ট করা জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যাংক, অনলাইন ও অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সি এবং সাধারণ ব্যবহারকারী—প্রতিটি স্তরে লেনদেনের প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, পাসপোর্ট এনডোর্সমেন্ট ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের রিপোর্টিং কীভাবে করতে হবে, তা দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

বর্তমানে ট্রাভেল কোটা নির্ধারিত হয় পাসপোর্টের এনডোর্সমেন্টের ভিত্তিতে। প্রশ্ন থেকে যায়, অনলাইন বা অফলাইনে টিকিট কাটার সময় গ্রাহক পাসপোর্ট কার কাছে জমা দেবেন বা কার মাধ্যমে ভেরিফাই করাবেন। সাধারণত এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কাটার সময় সরাসরি ব্যাংকে পাসপোর্ট দেখানোর প্রয়োজন হয় না। নতুন সিদ্ধান্তের পর এই প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসবে, তা জানাতে হবে।

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ ও স্পষ্ট হলে দেশের পর্যটন খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আগে ৩০০ ডলার সীমার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে কিংবা সুযোগ নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ উপায়ে লেনদেন করতেন। এখন ৩০০ ডলারের বেশি খরচের পথ উন্মুক্ত হওয়ায় মানুষ বৈধ চ্যানেলের দিকে ঝুঁকবেন। ফলে ডিজিটাল লেনদেনও বৃদ্ধি পাবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে শেয়ারট্রিপের মতো বৈশ্বিক বিনিয়োগ পাওয়া ও কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা করা সহজ হবে। পাশাপাশি সরকারের কাছে আউটবাউন্ড ও ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের সঠিক তথ্য থাকবে। কোন দেশে কতজন ঘুরতে গেলেন, কতজন চিকিৎসা করাতে বা পড়াশোনা করতে গেলেন এবং তাঁরা কত অর্থ খরচ করলেন, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এই তথ্য সরকারের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশভ্রমণে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা ১২ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করেছে। টোয়াবের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সীমা বাড়ানো হয়। এটিও ভ্রমণ খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশি টাকায় আন্তর্জাতিক হোটেল বুকিংয়ের সুযোগ তৈরি হওয়া। পর্যটন খাতের জন্য এটি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

শুধু আউটবাউন্ড পর্যটন নয়, ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের (বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশে আনা) প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে অন-অ্যারাইভাল ভিসা ও ই-ভিসা সহজ করা এবং বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতাকে আরও অতিথিপরায়ণ ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।