গ্রাহক সুরক্ষার কথা বলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে চায় সরকার। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজ চলছে আইন সংশোধনের। এমআরএ ইতিমধ্যে একটি খসড়াও দাঁড় করিয়েছে। বিদ্যমান আইনটি দুই দশক আগের।

আইন সংশোধনের খসড়ায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে প্রশাসকের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো যাবে।

এ নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পূর্ণাঙ্গ খসড়া পাঠানোর জন্য এমআরএকে বলা হয়েছে।

বর্তমানে কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক বসানোর একক ক্ষমতা এমআরএর নেই। নতুন আইনে সেই ক্ষমতা চায় সংস্থাটি। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগেও এমআরএকে অনাপত্তি জানানোর ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ব্র্যাকের চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চান না বলে জানান।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এমআরএর সঙ্গে আমরা কাজ করছি। শিগগিরই একটা যৌথ মতামত দেব।’

জানা গেছে, আইনের খসড়া প্রায় তিন মাস আগে ১২৯টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কিং সংস্থা ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামকে (সিডিএফ) দেয় এমআরএ। সংগঠনটি এরই মধ্যে কিছু বিষয়ে একমত এবং কিছু বিষয়ে দ্বিমত বলে জানিয়েছে। এরপর গত ১১ আগস্ট ঢাকার আগারগাঁওয়ে এমআরএর কার্যালয়ে আইন সংশোধনের ওপর বৈঠক হয়। আরও বৈঠক হবে।

এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এমআরএ আইন প্রণয়ন এবং এমআরএ গঠনের দুই দশক পার হয়েছে। এর মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে। এনজিও খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্যই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এমআরএকে কী ধরনের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে হেলালউদ্দিন বলেন, মাঠপর্যায়ের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বেতনের পার্থক্য অনেক বেশি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বিনা বেতনে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের শুক্র-শনিবারও খাটান। সিইওদের অনেকের বেতন ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা, যা অনেক ব্যাংকের এমডিরাও পান না। অনেক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা চান অভিজ্ঞতা কম থাকলেও তাঁদের সন্তানেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বসবেন। এ ধরনের অনেক বিষয় আছে, যা এ খাতের ভালোর জন্যই বদলানো দরকার।

পর্ষদ বাতিলের ক্ষমতা কেন

বর্তমানে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অপসারণের সুযোগ থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা নেই এমআরএর। আইন সংশোধন হলে পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রথমে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে এমআরএ, প্রয়োজনে প্রশাসকের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়াতে পারবে।

সিডিএফের চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার মুক্তকণ্ঠকে জানান, আইনের খসড়া বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন, এটি সরকারের বিনিয়ন্ত্রণ উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমআরএ অনেকটা হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটার মতো অবস্থা তৈরি করতে চাইছে।

মুর্শেদ আলম সরকার আরও বলেন, এত দিন ব্যাংক-বিমা খাতের যে সর্বনাশ হয়েছে, তার বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণ খাত ভালো ছিল। না বুঝে এটিকেও এখন বিপদে ফেলার চেষ্টা চলছে। এমআরএর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরবে এবং সরকারের বদনাম হবে।

এমআরএ অবশ্য বলছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদই যদি বড় ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন শুধু একজন-দুজনকে সরিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব না–ও হতে পারে।

লাইসেন্স ও সিইও নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কোম্পানি আইনসহ পাঁচ ধরনের আইনের অধীনে নিবন্ধিত হয়। আইন সংশোধন হলে তাদের নতুন করে এমআরএর লাইসেন্স নিতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে যুক্ত করতে হবে ‘এমএফআই’ শব্দ।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাধারণ পরিষদ ও পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে এমআরএর কাছে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে বাতিল হয়ে যাবে লাইসেন্স।

বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে এমআরএ সনদ দেয়। নতুন আইনে ‘সনদ’-এর পরিবর্তে ‘লাইসেন্স’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিডিএফ বলেছে, সনদের বদলে লাইসেন্স চালু করলে ক্ষুদ্রঋণ খাতের বিনিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এমআরএ আইনের নতুন নাম চায় ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথরিটি আইন’। অন্যদিকে সিডিএফ চায়, আইনের নাম হোক ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি আইন।’

বর্তমান আইনে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ সিইও নিয়োগ করে। নতুন আইনেও সেই ব্যবস্থা থাকবে। তবে নিয়োগের আগে এমআরএর কাছ থেকে অনাপত্তি নিতে হবে।

দেশের শীর্ষ ১০ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতকে ব্যাংক খাতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না। এ খাত একধরনের ‘ওনারশিপ’ নিয়ে কাজ করে এবং গরিবদের দোরগোড়ায় গিয়ে ঋণ দিয়ে পরে তা ফেরত নিয়ে আসে। যেভাবে আইনি কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে ক্ষুদ্রঋণ খাত থেকে অনেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।

কার্যক্রম বাড়বে, শাস্তিও হবে কঠোর

খসড়ায় সরকারের অনুমতি নিয়ে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করেছে এমআরএ। এতে সিডিএফ একমত। অন্যদিকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি গ্রাহকদের সামাজিক কল্যাণে ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সিডিএফ বলেছে, বর্তমান আইনেই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো অলাভজনক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

লাইসেন্স পাওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থ বা গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ বা তছরুপ করলে ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি তছরুপ করা অর্থ সুদসহ আদায়ের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এমআরএর যুক্তি, ক্ষুদ্রঋণে সাধারণত বন্ধক বা জামানত নেওয়া হয় না। ফলে পাওনা আদায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা বা চেক প্রত্যাখ্যানের মামলার ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে পাওনা আদায় সহজ হবে এবং গ্রাহকের হয়রানি কমবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফাইন্যান্সের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম এ বাকী খলীলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ক্ষুদ্রঋণের ধরন বদলে গেছে। বিদেশি অনুদান আর নেই, আছে ব্যাংকঋণ। এ খাত এখন সঞ্চয় নিচ্ছে, সামনে হয়তো জনগণের কাছ থেকে আমানত নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। এখানেই গ্রাহকদের সুরক্ষার প্রশ্নটি চলে আসে।

বাকী খলীলী বলেন, গ্রামীণ আর্থিক বাজারে বড় ভূমিকা পালন করে এ খাত। ফলে একটি বড় প্রতিষ্ঠানও যদি ব্যর্থ হয়, এর দায় পুরো খাতের ওপর পড়বে। সময়ের প্রয়োজনেই আইন সংশোধন দরকার। তবে দুই বছর পরই যেন তা আবার বদলাতে না হয়। তাই শুধু ক্ষুদ্রঋণ খাত নয়, আইন সংশোধনের জন্য ভালো পর্যায়ের অন্য অংশীজনদের সঙ্গেও সংলাপ দরকার।