টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এই গুরুতর অনিয়ম খতিয়ে দেখতে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ওই সেতুতে অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেনের নেতৃত্বে ওই অভিযানে অংশ নেন উপ-সহকারী মো. বাসেদ আলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। অভিযানে প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, "দুদকের পক্ষ থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা ফুটপাত স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি। এখানে রডের পরিমাণটা কম রয়েছে। রড ততটুকু থাকা দরকার, সেটুকু নেই।"
তিনি আরও জানান, "সরেজমিনে যে রিপোর্টটি তৈরি করেছি, সেটা আমাদের এক্সপার্ট আছে, ওনারা সরেজমিন প্রতিবেদন দেবেন। সেটার ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক সত্যতা পেলে আমরা কমিশনকে বিস্তারিতভাবে জানাব। তারপর কমিশন থেকে যে নির্দেশনা দেবে আমার পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করব।"
বাঁশের ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, "যে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো আমরা সরেজমিনে দেখতে পাইনি। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে সেগুলো দেখেছি। সেখানে সাটারিং-এ বাঁশের ব্যবহার আমরা দেখেছি।"
জানা গেছে, বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর ৯০ দশমিক শূন্য ছয় মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করে। স্থানীয়রা বাধা দিলে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয় এবং তারা ভিডিও ধারণ করেন। পরে রাতে পুনরায় কাজ শুরু করে ঢালাই শেষ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
ঘটনার পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক সেতুটি পরিদর্শন করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেন এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন।
এদিকে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানের করা মামলায় প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলমের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করেছে।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে এলজিইডির এক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ফলে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান জানান, ঠিকাদাররা তাদের অনুপস্থিতিতে রাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঢালাইয়ের কাজ করেছেন। তিনি বলেন, "বিষয়টিকে ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"