ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড হারিয়ে গেলে সময় নষ্ট করাই সবচেয়ে বড় ভুল। কার্ডটি অন্য কারও হাতে পড়লে অ্যাকাউন্ট থেকে অননুমোদিত লেনদেনের চেষ্টা হতে পারে। তাই কার্ড হারানোর পর প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধ বা সাময়িকভাবে স্থগিত করা।
বাংলাদেশের কিছু ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায় দ্রুত কার্ড বন্ধের সুবিধা রয়েছে। যেমন ইস্টার্ন ব্যাংকের স্কাইব্যাংকিং অ্যাপ ও ইবিএল স্মার্ট আইভিআরের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কার্ড বন্ধ করা যায়। তবে সব ব্যাংকের প্রক্রিয়া এক নয়; তাই নিজ ব্যাংকের দেওয়া পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে।
পাঁচ মিনিটে কার্ড বন্ধের মূল ধারণা
ব্যাংকের অ্যাপে কার্ড স্থগিত, বন্ধ, সাময়িক বন্ধ বা লক করার সুবিধা থাকলে সাধারণত কয়েকটি ধাপেই কাজটি করা যায়। অ্যাপ খুলে কার্ড অপশনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কার্ড নির্বাচন করে স্থগিত বা বন্ধের অপশনে চাপ দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোনো ব্যাংকে অ্যাপের বদলে আইভিআর বা হটলাইনের মাধ্যমে কার্ড বন্ধ করতে হয়। তাই কার্ড হারানোর আগেই নিজ ব্যাংকের এই সুবিধাটি কোথায় রয়েছে তা জেনে রাখা ভালো।
কার্ড হারালে কেন দ্রুত বন্ধ করবেন
কার্ড হারানোর পর যত দ্রুত ব্যাংককে জানানো যায়, তত দ্রুত নতুন লেনদেন ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হারানো কার্ডের কথা কার্ডধারী ব্যাংককে জানালে কার্ড ইস্যুকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধ করতে হবে। তাই প্রথম কয়েক মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ। কার্ড কোথায় পড়েছে বা পরে পাওয়া যাবে কি না, তা খুঁজতে গিয়ে ব্যাংককে জানানোর কাজ পিছিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
কার্ড হারালে ৫ ধাপে কী করবেন
সঙ্গে সঙ্গে কার্ড স্থগিত বা বন্ধ করুন: ব্যাংকের অ্যাপে কার্ড স্থগিত বা বন্ধের অপশন থাকলে সেটি ব্যবহার করুন। না থাকলে ব্যাংকের অফিসিয়াল হটলাইনে ফোন করে কার্ড বন্ধের অনুরোধ করুন।
কার্ডটি সত্যিই হারিয়েছে কি না যাচাই করুন: কার্ডটি কোথাও পড়ে আছে কি না দ্রুত খুঁজে দেখুন। তবে খোঁজার জন্য কার্ড বন্ধের সিদ্ধান্ত অনেকক্ষণ পিছিয়ে রাখবেন না। কিছু ব্যাংকে সাময়িকভাবে কার্ড স্থগিত করা যায়; পরে কার্ড পাওয়া গেলে ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী আবার চালু করা যেতে পারে। স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেলে নতুন কার্ডের প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কয়েকটি লেনদেন দেখুন: কার্ড হারানোর পর ব্যাংক অ্যাপ বা খুদে বার্তা থেকে সাম্প্রতিক লেনদেনগুলো দেখুন। আপনি করেননি এমন লেনদেন থাকলে সেটি আলাদাভাবে নোট করে ব্যাংককে জানান।
ব্যাংককে অননুমোদিত লেনদেনের কথা জানান: কার্ড হারানোর আগে বা পরে কোনো অচেনা লেনদেন হয়ে থাকলে ব্যাংকের অফিসিয়াল গ্রাহকসেবায় দ্রুত অভিযোগ করুন। কার্ড নম্বর, লেনদেনের সময়, টাকার পরিমাণ এবং খুদে বার্তা বা সতর্কবার্তা থাকলে সেগুলো সংরক্ষণ করুন।
প্রয়োজন হলে নতুন কার্ড নিন: কার্ডটি স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেলে শুধু সাময়িকভাবে বন্ধ করে রাখাই যথেষ্ট নয়। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী হারানো কার্ডের বিষয়ে জানিয়ে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করুন।
ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে কি একই নিয়ম
মূল নিরাপত্তা পদক্ষেপ একই—কার্ড হারালে দ্রুত বন্ধ বা স্থগিত করা। তবে পরবর্তী প্রক্রিয়া ব্যাংক ও কার্ডের ধরন অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। ক্রেডিট কার্ডে অননুমোদিত লেনদেন হলে ব্যাংককে দ্রুত জানানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অর্থ জড়িত থাকায় একইভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কার্ডের পিন জানলে ঝুঁকি আরও বেশি
হ্যাঁ। কার্ডের সঙ্গে পিন বা অন্যান্য নিরাপত্তা তথ্য অন্য কারও হাতে গেলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কার্ড হারানোর পাশাপাশি পিন প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে হলে ব্যাংককে জানান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পিন পরিবর্তন করুন। কার্ডের পিন কখনো কার্ডের সঙ্গে লিখে রাখা উচিত নয়। ফোনের নোট, মেসেজ বা সহজে পাওয়া যায় এমন জায়গায় পিন সংরক্ষণ করাও নিরাপদ নয়।
কার্ডের তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণ করে রাখলে কী করবেন
অনেকে অনলাইন কেনাকাটার সুবিধার জন্য কার্ডের তথ্য বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা অ্যাপে সংরক্ষণ করেন। কার্ড হারিয়ে গেলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কোন কোন সেবায় কার্ডটি ব্যবহার করা হয়েছে তা মনে করা। কার্ডটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করলে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব অ্যাকাউন্টে নতুন কার্ডের তথ্য দিতে হবে। তবে কার্ড হারানোর মুহূর্তে প্রথম অগ্রাধিকার হলো কার্ডটি বন্ধ করা।
কার্ড হারানোর পর ব্যাংককে কী তথ্য দেবেন
ব্যাংকে যোগাযোগের সময় পরিচয় যাচাইয়ের জন্য কিছু তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—কার্ডধারীর নাম, অ্যাকাউন্টের তথ্য, কার্ডের শেষ কয়েকটি সংখ্যা, মোবাইল নম্বর, সাম্প্রতিক লেনদেনের তথ্য। তবে ফোনে কেউ ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয় দিলেই পিন, ওটিপি বা পূর্ণ কার্ড নিরাপত্তা কোড দিয়ে দেবেন না। ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সবসময় অফিসিয়াল নম্বর বা অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করুন।
ব্যাংকে অভিযোগ করেও সমাধান না হলে কী করবেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র বা সিআইপিসি ব্যাংকিং-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমস্যা হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে। সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভিযোগকেন্দ্রে অভিযোগ করা যায়। এরপরও সমস্যা থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইপিসিতে অভিযোগ করা যায়। সিআইপিসির হটলাইন ১৬২৩৬। এছাড়া ই-মেইল ও অনলাইন অভিযোগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কার্ড হারানোর আগেই যে প্রস্তুতি রাখবেন
কার্ড হারানোর সময় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চাইলে আগে থেকেই কয়েকটি কাজ করে রাখুন। ব্যাংকের অ্যাপ ইনস্টল রাখুন এবং কার্ড বন্ধের সুবিধা কোথায় আছে তা দেখে রাখুন। ব্যাংকের হটলাইন নম্বর সংরক্ষণ করুন; কার্ড হারানোর পর ইন্টারনেটে নম্বর খুঁজতে গেলে ভুয়া নম্বরে যোগাযোগের ঝুঁকি থাকতে পারে। খুদে বার্তা ও লেনদেনের সতর্কবার্তা চালু রাখুন, এতে অচেনা লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করা সহজ হবে। কার্ডের ছবি তুলে রাখবেন না, বিশেষ করে নিরাপত্তা নম্বর ও পিনসহ কার্ডের তথ্য ফোনের গ্যালারিতে রাখা নিরাপদ নয়। পিন গোপন রাখুন।
ব্যাংক কার্ড হারানো মানেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত কার্ডটি বন্ধ বা স্থগিত করা। ব্যাংকের অ্যাপে এই সুবিধা থাকলে কয়েকটি চাপেই কাজটি করা সম্ভব। আর অ্যাপে সুবিধা না থাকলে ব্যাংকের অফিসিয়াল হটলাইনে যোগাযোগ করুন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও হারানো কার্ডের বিষয়টি ব্যাংককে দ্রুত জানানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। তাই কার্ড কোথায় হারিয়েছে তা খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে আগে কার্ডের ব্যবহার বন্ধ করুন, তারপর প্রয়োজনীয় অভিযোগ ও নতুন কার্ডের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।