গ্যালারি চিত্রে শিল্পী মুবাশ্বির মজুমদারের ‘ওভারল্যাপ’ শীর্ষক দ্বিতীয় একক চিত্র প্রদর্শনী চলছে। ২৪ সেপ্টেম্বর এই প্রদর্শনী শেষ হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতির উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শিল্পী তার সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করেছেন।
মুবাশ্বির মজুমদারের শিল্পধারা মূলত চিন্তা ও দেখার স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস। তিনি ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও পেশায় গ্রাফিকস ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন এবং ক্যালিগ্রাফি, কবিতা লেখা ও গীতিকার হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। তবে নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধারায় আবদ্ধ রাখেননি তিনি। গত দশক ধরে তিনি অপ্রকাশ্য অনুভূতিকে প্রকাশের প্রতি নিমগ্ন আছেন, যেখানে কোনো কিছুর সঙ্গে আপস নেই।
মূর্ত থেকে বিমূর্ত বা বিমূর্তকে মূর্ত করার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ রয়েছে। বাংলাদেশের শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মনিরুল ইসলাম এবং পশ্চিমা শিল্পী মার্ক রথকো, আলবার্তো বুরি, অ্যান্টনিও তাপিস ও আনসেলম কিফারের প্রতি তাঁর অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। যদিও তিনি কোনো শিল্পীর অনুপ্রেরণা গোপন করেননি, যা তাঁর সৃষ্টির শক্তিকে আরও জোরদার করেছে।
বিমূর্ত ও প্রকাশবাদী ধারার এই চিত্রপটগুলো দেখা ও চিন্তার মুহূর্তের অনুভূতিকে ধারণ করে। তীব্র গতিতে কাগজ ছিঁড়ে ছিঁড়ে সাজানো দৃশ্যপটে দেখা ও না দেখা প্রকৃতির অংশ ফুটে উঠেছে। প্রকৃতির বিচিত্র রূপ থেকে মুবাশ্বিরের আঁকা চিত্রপট আলাদা করা যায় না আপাতদৃষ্টিতে। তবে আপন অনুভূতিকে প্রকাশ করার ক্ষীপ্রতা এক বিশেষ শিল্পভাষার জন্ম দেয়; বিকশিত হয় পর্যায়ক্রমে মুবাশ্বির মজুমদারের শিল্পশৈলী।
২০২৩ সালে ঢাকায় প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্পী মুবাশ্বির মজুমদারের স্বপ্রণোদিত শিল্পভাষার সঙ্গে শিল্পরসিকদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কালো রংপ্রধান সেই চিত্রমালা প্রকাশবাদী ধারার ছিল, যেখানে সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণতার বোধ ছিল। এবারের দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে ওই বৈশিষ্ট্যের আপাত পরিণত প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। ছেঁড়া কাগজ-কোলাজ মাধ্যমে এবারের চিত্রমালা মাটির কাছে ফিরে এসেছে, প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়েছে।
মুবাশ্বির মুজমদারের শিল্পযাত্রা ক্ষণিকের মনে হলেও সেটা আসলে প্রকৃতিমুখী; মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার এক অন্তিম ভাষা। প্রকৃতির প্রতি তাঁর এই নিবিড় টান থেকেই শিল্পী হিসেবে তাঁর গড়ে তোলা চিত্রপট আত্মপ্রকাশের পক্ষে আপসহীনতার দলিল। মাটিতে থাকা রঙের নানা তল তাঁর চিত্রপটে মাটি হয়েই আসে। ক্ষমতার কান্ডারি হয়ে নয়, অনুভূতির শক্তিতেই মুবাশ্বির অনেক সাবলীল। কখনো কখনো এ সাবলীলতা সুরের ঐক্য তৈরি করে ধীরে, দূরে।
মুবাশ্বির মজুমদারের শিল্পধারা-শিল্পীর চিন্তা ও দেখার স্বাধীনতারই উচ্ছ্বাস। স্বাধীনতা প্রকাশের পটভূমি তৈরি না হলে শিল্প প্রাণহীন। শিল্পের ডাকে মনের সাড়া মেলে বিস্মিত হলে। এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার মুখোমুখি করে মুবাশ্বিরের সৃষ্টি। তাঁর চিত্রচর্চা শিল্পসৃষ্টির শর্তে অনেক প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে ম্লান করে দেয়, সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে। সত্য-মিথ্যা, বাস্তব-অবাস্তবের সীমানা পেরিয়ে শিল্পের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ মেলে। আবার শিল্পের জন্ম হয়, প্রাণ ফেরে শিল্পের।